মাথাভাঙা: রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর থেকেই যেন এক অদ্ভুত ও নজিরবিহীন দৃশ্যের সাক্ষী হচ্ছে বাংলার সাধারণ মানুষ! এতদিন যে কাটমানি ও তোলাবাজির টাকা আদায় নিয়ে ভুক্তভোগীদের চোখের জল ফেলতে হতো, এবার সেই পাপের টাকাই প্রকাশ্য দিবালোকে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন দাপুটে তৃণমূল নেতারা।
রবিবার কোচবিহারের মাথাভাঙা এলাকায় ঘটল এমনই এক ঐতিহাসিক ও চোখ কপালে তোলার মতো ঘটনা। গণ-পিটুনি বা আইনি খাঁড়া থেকে বাঁচতে একেবারে গ্রামের স্কুল মাঠে মাইক বাজিয়ে, সবাইকে ডেকে নিয়ে থরে থরে সাজানো দুর্নীতির টাকা উপভোক্তাদের হাতে ফেরত দিলেন স্থানীয় শাসকদলের নেতারা। এমনকি মূল অভিযুক্ত প্রভাবশালী নেতা এলাকা ছেড়ে চম্পট দিলেও, গণ-আদালতের ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে ছেলের হয়ে সেই টাকা ফিরিয়ে দিলেন বৃদ্ধ বাবা! এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে উত্তরবঙ্গে তীব্র আলোড়ন তৈরি হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মাথাভাঙা-১ ব্লকের পচাগড় গ্রাম পঞ্চায়েতের ফকিরেরকুঠি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষের ওপর একচেটিয়া জুলুম চালাচ্ছিল স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব। অভিযোগ, ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পর থেকেই এলাকায় কেউ জমি বিক্রি করতে গেলে, কিংবা সরকারি আবাস যোজনার ঘর পাইয়ে দেওয়ার নাম করে উপভোক্তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা কাটমানি খাওয়া হয়েছিল। শুধু তাই নয়, রাজনীতির রঙ দেখে বিজেপি সমর্থকদের ওপর চলত চরম অত্যাচার।
কারণ ছাড়াই ভয় দেখিয়ে তোলাবাজি চলত অবিরত। বিজেপির মাথাভাঙা-৪-এর মণ্ডল সভাপতি সুরেন্দ্র বর্মণ স্পষ্ট জানিয়েছেন, ওই এলাকার পঞ্চায়েত সদস্য এবং কয়েকজন তৃণমূল নেতা মিলে নিরীহ মানুষদের কাছ থেকে প্রায় ৮০ লক্ষ টাকা লুঠ করেছিলেন বলে সুনির্দিষ্ট হিসাব মিলেছে। কিন্তু রাজ্যে নতুন সরকার আসতেই পরিস্থিতি রাতারাতি বদলে যায়। দুর্নীতির দায়ে রাজ্যের দিকে দিকে তৃণমূলের বড় বড় রাঘববোয়ালরা যখন শ্রীঘরে ঢুকছেন, তখন নিজেদের পিঠ বাঁচাতে অভিনব এই ‘টাকা ফেরত মেলা’র আয়োজন করেন স্থানীয় নেতারা।
রবিবার সকালে ফকিরেরকুঠি এলাকার একটি স্থানীয় স্কুল মাঠে এলাকার সর্বস্তরের মানুষদের ডাকেন তৃণমূলের বুথ সভাপতি তপন দে। সেখানে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে বিভিন্ন সময়ে নেওয়া সাধারণ মানুষের টাকা খাতায় নাম মিলিয়ে এক এক করে ফিরিয়ে দিতে শুরু করেন। তবে সবচেয়ে বড় ড্রামাটিক দৃশ্য তৈরি হয় এলাকার অন্যতম ‘প্রভাবশালী’ তৃণমূল নেতা বাবাই বর্মণের ক্ষেত্রে। নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই গণরোষের ভয়ে এলাকাছাড়া বাবাই। কিন্তু গ্রামের মানুষের রোষ থেকে নিজেদের পরিবারকে বাঁচাতে এদিন ময়দানে নামেন বাবাই বর্মণের বৃদ্ধ বাবা। ছেলের অনুপস্থিতিতে তিনি নিজেই কয়েক জনের কাটমানির টাকা গুনে গুনে ফেরত দেন। টাকা ফেরত পেয়ে স্থানীয় বাসিন্দা সুদীপ দাস স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে জানান, একটি জমির মীমাংসা করার নামে তাঁর কাছ থেকে কয়েক হাজার টাকা কামিয়েছিলেন ওই নেতা। কিন্তু কোনও কাজ না করে টাকা হজম করে নেওয়া হয়। আজ সেই টাকা তিনি ফেরত পেলেন। একই সুর শোনা গিয়েছে মিঠুন বর্মণ ও নিখিল বর্মণের গলাতেও। তাঁরা বিজেপি করেন বলেই তাঁদের ওপর চরম জুলুম চালিয়ে টাকা আদায় করা হয়েছিল, যা আজ তাঁরা ফিরে পেয়েছেন।
গ্রামের মোড়ে মোড়ে যখন এই টাকা ফেরতের ঘটনা নিয়ে শোরগোল, তখন স্বাভাবিকভাবেই চরম অস্বস্তিতে পড়েছে জেলা তৃণমূল নেতৃত্ব। স্কুল মাঠে দাঁড়িয়ে যাঁরা এই বিপুল পরিমাণ টাকা গ্রামবাসীদের হাতে তুলে দিলেন, সেই তৃণমূল নেতাদের কাউকেই এই বিষয়ে সংবাদমাধ্যমের সামনে মুখ খুলতে দেখা যায়নি। ক্যামেরা দেখেই তাঁরা কার্যত হাত দিয়ে মুখ লুকিয়ে চম্পট দেন। অন্যদিকে, বিজেপির দাবি, এটা কেবল ট্রেলার; আগামী দিনে এই অঞ্চলের সমস্ত দুর্নীতিবাজ নেতাদের থেকে পাই-পয়সা হিসাব করে বাংলার গরিব মানুষদের পকেটে ফেরানো হবে। তবে কারণ যাই হোক না কেন, বছরের পর বছর ধরে শোষিত হওয়ার পর আজ প্রকাশ্য মাঠে নিজেদের হকের টাকা ফেরত পেয়ে মাথাভাঙার সাধারণ মানুষের মুখে চওড়া হাসি ফুটেছে।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩১ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন