সোনারপুর: বঙ্গে পরিবর্তনের হাওয়া লাগতেই এবার কাটমানি সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে খোদ সাধারণ মানুষের আক্রোশ আছড়ে পড়ল দক্ষিণ ২৪ পরগনায়। আবাস যোজনা থেকে শুরু করে জমি বেচাকেনা, এমনকি সাধারণ পারিবারিক বিবাদ মেটাতেও দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের পকেট কেটে কোটি কোটি টাকার ‘কাটমানি’ তোলার মারাত্মক অভিযোগ উঠল এক দাপুটে তৃণমূল নেতার বিরুদ্ধে। শুক্রবার সেই সমস্ত শোষিত ও প্রতারিত সাধারণ মানুষ একজোট হয়ে সোনারপুরের সাঙ্গুর গ্রামে ওই তৃণমূল নেতার বাড়ি ঘেরাও করে তুমুল বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন। বেগতিক বুঝে অভিযুক্ত তৃণমূল নেতা বাড়ি ছেড়ে চম্পট দিলেও, উন্মত্ত জনরোষের হাত থেকে বাঁচতে শেষ পর্যন্ত হাতজোড় করে সমস্ত কাটমানির টাকা কানাকড়ি-সহ মিটিয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিতে বাধ্য হলেন তাঁর স্ত্রী।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, সোনারপুরের সাঙ্গুর গ্রামের বাসিন্দা উপেন্দ্র মণ্ডল দীর্ঘদিন ধরে তৃণমূলের বড় পদের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে এলাকায় কার্যত একনায়কতন্ত্র চালাতেন। গ্রামীণ গরিব মানুষের জন্য আসা সরকারি আবাস যোজনার বাড়ি পাইয়ে দিতে উপভোক্তাদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে শুরু করে এক এক জনের থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত কাটমানি পকেটে পুরেছেন তিনি। ক্ষুব্ধ গ্রামবাসীদের দাবি, শুধু আবাস যোজনাই নয়, গরিব মানুষের ১০০ দিনের কাজের জব কার্ড এবং রেশন কার্ড পর্যন্ত নিজের জিম্মায় বন্ধক রেখে দিয়েছিলেন এই তৃণমূল নেতা, যাতে সরকারি টাকা উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে ঢুকলেই তিনি তা জোর করে তুলে নিতে পারেন। শুক্রবার উপেন্দ্র মণ্ডলের বাড়ি ঘিরে ধরে এক প্রৌঢ় গ্রামবাসী হুঙ্কার দিয়ে বলেন, “আমাদের সব কার্ড ও জমা রেখে দিয়েছে। আমাদের টাকা ও কোথা থেকে দেবে তা ও বুঝে নিক, তবে মারধরের আগে যেন সব টাকা ফেরত দিয়ে দেয়!”
এলাকার ৫০-৬০ জনের কাছ থেকে এভাবে লাখ লাখ টাকা ইচ্ছামতো তোলার পর সেই দুর্নীতির টাকা কার কার পকেটে যেত, তা নিয়েও এবার বিস্ফোরক দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। বিক্ষোভকারীদের দাবি, উপেন্দ্র মণ্ডল যে কাটমানি সাধারণ মানুষের রক্ত জল করা উপার্জনের থেকে ছিনিয়ে নিতেন, তার একটি বড় অংশ সোজা পৌঁছে যেত স্থানীয় পঞ্চায়েত সদস্য প্রশান্ত সর্দারের গোপন ডেরায়। উপেন্দ্রর বাড়ি ঘেরাও করার পর উত্তেজিত জনতা এরপর সোজা চড়াও হয় ওই পঞ্চায়েত সদস্যের বাড়িতেও। তবে গণপিটুনির ভয়ে থরথর করে কাঁপতে থাকা পঞ্চায়েত সদস্য প্রশান্ত সর্দার সমস্ত দায় ঝেড়ে ফেলে দাবি করেন, তিনি নাকি কোনো টাকা নেননি, যা করার সব উপেন্দ্র একাই করেছেন! স্বাভাবিকভাবেই এখন প্রশ্ন উঠছে, এই বিপুল পরিমাণ কাটমানির ভাগ আদতে কত দূর নবান্ন বা কালীঘাট পর্যন্ত পৌঁছেছে?
তৃণমূল নেতা উপেন্দ্র মণ্ডল এলাকা ছেড়ে ‘পলাতক’ হলেও তাঁর বাড়ি ঘিরে বিক্ষোভের তীব্রতা ক্রমশ বাড়তে থাকে। পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে এবং ক্ষুব্ধ জনতা ভাঙচুর শুরু করার উপক্রম করতেই উপেন্দ্রর স্ত্রী বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে গ্রামবাসীদের শান্ত করার চেষ্টা করেন। তিনি প্রকাশ্যেই হাতজোড় করে আশ্বাস দেন যে, তাঁর স্বামী যে সমস্ত টাকা কাটমানি হিসেবে তুলেছেন, তা তাঁরা ধীরে ধীরে সমস্ত উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে ফেরত দিয়ে দেবেন। কিন্তু গ্রামবাসীরা কোনো মুখের কথায় বিশ্বাস করতে নারাজ। বিক্ষোভরত গ্রামবাসীদের সাফ কথা, “এরা ভেবেছিল তৃণমূল যতদিন ক্ষমতায় থাকবে, ততদিন এভাবেই গরিবের রক্ত চুষে টাকা তুলে যাবে? এখন পিঠ বাঁচাতে সবাই দায় এড়াতে ব্যস্ত, কিন্তু টাকা আমরা উসুল করেই ছাড়ব।” এই কাটমানি কাণ্ডকে কেন্দ্র করে বর্তমানে সোনারপুর জুড়ে তীব্র উত্তেজনা বিরাজ করছে।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১২ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন