সল্টলেক: রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর থেকেই দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের বিরুদ্ধে যে ব্যাপক পুলিশি তৎপড়তা শুরু হয়েছে, এবার তার জালে জড়ালেন খোদ তৃণমূল কংগ্রেসের দাপুটে রাজ্য মুখপাত্র তথা বর্ষীয়ান নেতা জয়প্রকাশ মজুমদার। দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে এক অসহায় বিধবা বৃদ্ধার বাড়ি জোরপূর্বক দখল করে রাখা, ভাড়া চাইতে গেলে উল্টে শ্লীলতাহানি এবং প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার মারাত্মক অভিযোগে বুধবার সল্টলেক থেকে গ্রেফতার করা হলো এই হেভিওয়েট নেতাকে। এদিন পুলিশ তাঁকে ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় ক্ষুব্ধ জনতা এবং বিজেপি কর্মী-সমর্থকরা তাঁকে লক্ষ্য করে চোর চোর স্লোগান তুলতে শুরু করলে এলাকা এক্কেবারে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয়। দীর্ঘ টানাপোড়েনের পর উত্তর বিধাননগর থানার পুলিশ এই প্রভাবশালী নেতাকে লোহার গরাদের পেছনে পুরেছে।
এই নজিরবিহীন ঘটনার সূত্রপাত সল্টলেকের বাসিন্দা আরতি রায়চৌধুরী নামের এক বৃদ্ধার লিখিত অভিযোগকে কেন্দ্র করে। আরতি দেবীর পরিবারের দাবি, দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে তাঁদের নিজস্ব বাড়িটি বেআইনিভাবে কব্জা করে রেখেছিলেন জয়প্রকাশ মজুমদার। আরতি দেবীর মেয়ের অভিযোগ, নিজের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও গত এক দশক ধরে তাঁর বৃদ্ধা মাকে এদিক-ওদিক পরিযায়ীর মতো ভাড়া বাড়িতে মাথা গুঁজে দিন কাটাতে হচ্ছে। এলাকার বাসিন্দারাও এদিন ক্ষোভে ফেটে পড়ে জানান, আরতি দেবীর স্বামী মারা যাওয়ার পর অসহায়তার সুযোগ নিয়ে তাঁকে কার্যত ঘাড় ধাক্কা দিয়ে নিজের বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন এই তৃণমূল নেতা। আইনিভাবে বাড়ি খালি করার জন্য বারবার নোটিস পাঠানো হলেও ক্ষমতার অহংকারে সেই সমস্ত নোটিসকে পাত্তাই দেননি তিনি।
বুধবার বিকেলে জয়প্রকাশ মজুমদারকে এলাকায় দেখতে পেয়েই আরতি রায়চৌধুরী এবং তাঁর পরিবারের সদস্যরা রাস্তায় গাড়ি আটকে সরাসরি ক্ষোভ উগরে দেন। মাঝরাস্তাতেই শুরু হয় তীব্র বচসা। পরিবারের তরফ থেকে হাতজোড় করে বাড়ির চাবি ও তালা খুলে দেওয়ার অনুরোধ করা হলেও জয়প্রকাশ বাবু উল্টে দুর্ব্যবহার করেন বলে অভিযোগ। এই দৃশ্য দেখে আর নিজেদের ধরে রাখতে পারেননি স্থানীয় বাসিন্দারা। মুহূর্তের মধ্যে সেখানে শয়ে শয়ে মানুষ জড়ো হয়ে জয়প্রকাশ মজুমদারকে ঘিরে ধরে ‘চোর চোর’ স্লোগান দিতে শুরু করেন। উত্তেজনা চরম সীমায় পৌঁছালে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে আসে উত্তর বিধাননগর থানার বিশাল পুলিশ বাহিনী। ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে তৃণমূল মুখপাত্রকে উদ্ধার করে সোজা থানায় নিয়ে যাওয়া হয়।
থানায় গিয়ে জয়প্রকাশ মজুমদারের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, জোর করে সম্পত্তি দখল, বাড়ির মালিক আরতি রায়চৌধুরীকে ভয় দেখানো এবং শ্লীলতাহানির মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ও গুরুতর ধারায় এফআইআর (FIR) দায়ের করেন নির্যাতিতা বৃদ্ধা। পুলিশ প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদের পর বয়ানে অসঙ্গতি মেলায় প্রথমে তাঁকে আটক এবং পরে সরাসরি গ্রেফতার করে। উত্তর বিধাননগর থানা সূত্রে জানা গেছে, ধৃত তৃণমূল মুখপাত্রের বিরুদ্ধে মামলার ধারাগুলি অত্যন্ত জোরালো এবং তদন্তের স্বার্থে তাঁকে নিজেদের হেফাজতে নিতে আগামীকালই বিধাননগর মহকুমা আদালতে পেশ করা হবে। বঙ্গে ক্ষমতার হাতবদল হতেই যেভাবে একের পর এক প্রভাবশালী নেতার সাজানো সাম্রাজ্য ভেঙে পড়ছে, জয়প্রকাশের এই পরিণতি তারই আরও এক জলজ্যান্ত প্রমাণ বলে মনে করছে রাজনৈতিক মহল।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন