কলকাতা: ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে বাংলায় রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এবার সবথেকে বড় ও ঐতিহাসিক ওলটপালট ঘটে গেল টলিউড বা টালিগঞ্জ স্টুডিও পাড়ায়। বিগত এক দশক ধরে টলিউড কাঁপানো ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর দাপট এবং একাধিপত্যের এবার চিরতরে অবসান ঘটল। ছাব্বিশের নির্বাচনে তৃণমূল হেভিওয়েট অরূপ বিশ্বাসের পরাজয়ের পর, বুধবার টেকনিশিয়ান স্টুডিও থেকে তাঁর ভাই স্বরূপ বিশ্বাসের নেতৃত্বাধীন ‘ফেডারেশন’ এবং তার আওতাভুক্ত ২৬টি গিল্ডের অস্তিত্ব এক লহমায় মুছে দিলেন নতুন বিজেপি বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী।
টলিউডের ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা করে তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, এবার থেকে আর কোনও মাফিয়ারাজ বা সিন্ডিকেট চলবে না; ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সহায়তায় দিল্লির ‘ইস্টার্ন ইন্ডিয়া মোশন পিকচার্স কনফেডারেশন’ (কনফেডারেশন)-এর অধীনেই পরিচালিত হবেন টলিউডের সমস্ত কলাকুশলী। আর এই মেগা ঘোষণার পরই খোদ টলিউডের অন্দরে শুরু হয়েছে তীব্র আলোড়ন।
টালিগঞ্জের নতুন বিধায়ক পাপিয়া অধিকারী সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, টলিউডে আর পুরনো ফেডারেশনের কোনও অস্তিত্ব থাকবে না, একই সঙ্গে অবলুপ্ত করা হচ্ছে ২৬টি গিল্ডকেও। তার বদলে গোটা ইন্ডাস্ট্রিকে স্রেফ তিন থেকে চারটি প্রধান কমিটির মাধ্যমে সুসংগঠিত করা হবে— যার মধ্যে থাকবে পরিচালক, ক্যামেরা, প্রোডাকশন ম্যানেজার এবং শিল্প নির্দেশনা (আর্ট ডিরেকশন) বিভাগ। এই প্রসঙ্গে পাপিয়া খোলসা করেন যে, বিশিষ্ট পরিচালক সৃজিত মুখোপাধ্যায়ের বিশেষ অনুরোধেই এই শিল্প নির্দেশনা বিভাগটিকে আলাদা কমিটি হিসেবে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বুধবার সকালে টেকনিশিয়ান স্টুডিওতে গিল্ডের মুখপাত্রদের পাশাপাশি প্রযোজক অশোক ধনুকা, পরিচালক অতনু বসু এবং অভিনেত্রী কাঞ্চনা মিত্র, মুমতাজ সরকার ও মৌবনী সরকার-সহ প্রায় ৩৫ জন বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বদের নিয়ে এক হাই-ভোল্টেজ বৈঠক সারেন পাপিয়া। সেখানে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, নতুন নিয়মে মতবিরোধ থাকলেও টলিউডে আর কাউকে অন্যায়ভাবে ‘ব্যান’ বা নিষিদ্ধ করা যাবে না এবং কোনও কারণেই শুটিং বন্ধ করা চলবে না।
টলিউডকে সম্পূর্ণ দুর্নীতিমুক্ত করার লক্ষ্যে হুঙ্কার দিয়েছেন পাপিয়া অধিকারী। ফেডারেশন ও গিল্ডের একাংশের বিরুদ্ধে জমা হওয়া ভুরি ভুরি কাটমানি ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে তিনি স্পষ্ট জানান, তিনি পুলিশের কাছে যাবেন না; বরং নিজস্ব ‘ডি কিউব’ (D3 - ডিটেক্ট, ডিলিট এবং ডিপোর্ট) ফর্মুলা ব্যবহার করে অভিযুক্তদের চিহ্নিত করবেন, তাঁদের ক্ষমতা মুছে দেবেন এবং শেষে ইন্ডাস্ট্রি থেকে পুরোপুরি বার করে দেবেন।
এই ভয়ঙ্কর ‘ডি কিউব’ নীতির কোপে পড়ে ইতিমধ্যেই টলিউডে কাজ হারানোর তালিকায় চলে এসেছেন ম্যানেজার গিল্ডের সম্পাদক ও সহ-সম্পাদক মহম্মদ হাসান ও নিরুপম দে, মেকআপ আর্টিস্ট গিল্ডের বাপি মালাকার এবং ক্যামেরা গিল্ডের স্বপন মজুমদার ও সুজিত হাজরা। পাপিয়া সাফ জানিয়েছেন, এঁরা চাইলে ভিন রাজ্যে কাজ করতে পারেন, কিন্তু বাংলায় আর নয়। এর পাশাপাশি টলিউডের কলাকুশলীদের দীর্ঘদিনের শোষণ বন্ধ করতে বলিউডের মতো দিনে মাত্র ৮ ঘণ্টা কাজের সময়সীমা চালুর নীতি এবং কলাকুশলীদের পরিবারের জন্য কনফেডারেশনের তরফে স্বাস্থ্য বিমা দেওয়ার কথাও ঘোষণা করেছেন তিনি।
টালিগঞ্জের বিগত জমানার অন্ধকার অধ্যায়ের কথা স্মরণ করে এদিন বেশ আফসোসের সুর শোনা যায় নতুন বিধায়কের গলায়। পাপিয়া অধিকারী ক্ষোভের সঙ্গে বলেন, আমাদের সোনালী সময়ে পরিচালকরা ছিলেন ‘ক্যাপ্টেন অফ দ্য শিপ’ বা জাহাজের আসল চালক; কিন্তু গত কয়েক বছরে এই ফেডারেশনের দাপটে পরিচালকরা যেন একেকজন ‘চাকর’-এ পরিণত হয়েছিলেন।
এবার সেই হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনা হবে এবং একজন পরিচালকই সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি কতজন ক্রু নিয়ে কাজ করবেন, সেখানে কোনও জোরজুলুম খাটবে না। ওটিটি (OTT) প্ল্যাটফর্ম এবং টিভি চ্যানেলগুলি ধারাবাহিক ও সিরিজের জন্য কোথা থেকে টাকা পাচ্ছে এবং তার গল্প বা বিষয়বস্তু কী, তাও এবার খতিয়ে দেখা হবে। একই সঙ্গে ‘বিশ্বাস ব্রাদার্স’-এর নোংরা রাজনীতির কারণে এতদিন যে সমস্ত প্রথম সারির প্রযোজক, পরিচালক ও অভিনেতা ব্রাত্য হয়ে ঘরে বসেছিলেন, তাঁদের সসম্মানে ইন্ডাস্ট্রিতে ফিরিয়ে আনা এবং ভিন রাজ্য থেকে বাংলায় প্রচুর কাজের সুযোগ এনে দেওয়ার ১০০ শতাংশ আশ্বাস দিয়েছেন পাপিয়া।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন