কলকাতা: বাংলার রাজনীতিতে যেন এক মহাসুনামি আছড়ে পড়ল! মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাশে থাকা শেষ কয়েকজন বিশ্বস্ত সেনাপতিও এবার এক লহমায় দলনেত্রীর হাত ছেড়ে সোজা পা বাড়ালেন নবান্নের দিকে। বারাসতের বিদায়ী সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদারের তৈরি করা বিদ্রোহের পথেই এবার হাঁটলেন ফিরহাদ হাকিম, কুণাল ঘোষ এবং নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো হেভিওয়েটরা।
বুধবার মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ডাকা কলকাতা, হাওড়া এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার মেগা প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে সশরীরে নবান্নের সভাঘরে পৌঁছে গেলেন তাঁরা। গতকাল পর্যন্তও যাঁরা ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে মমতার ধর্না মঞ্চে বসে দলের জন্য গলা ফাটিয়েছিলেন, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দুর মুখোমুখি তাঁদের এই উপস্থিতি বাংলার রাজনীতিতে শাসকদলের সম্পূর্ণ পতন এবং এক নজিরবিহীন অধ্যায়ের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
তৃণমূলের এই বেনজির ভাঙনের স্রোত বুধবার সকাল থেকেই তীব্র আকার ধারণ করেছিল। গত সোমবার দলবিরোধী কাজের অপরাধে বহিষ্কৃত হওয়া উলুবেড়িয়া পূর্বের বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা আজই ৫৮ জন বিধায়কের সই নিয়ে বিধানসভায় এক সমান্তরাল শক্তি প্রদর্শন করেছেন। তাঁরা স্পিকার রথীন্দ্রনাথ বসুকে স্পষ্ট চিঠি দিয়ে ঋতব্রতকে নতুন ‘বিরোধী দলনেতা’ এবং সাবিনা ইয়াসমিন, জাভেদ খান, শিউলি সাহা ও সন্দীপন সাহাকে উপদলনেতা করার দাবি জানিয়েছেন। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা হিসেবে মানতে সাফ অস্বীকার করেছেন এই বিদ্রোহীরা। স্পিকার এই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে বুধবার বিকেল ৪টে পর্যন্ত সময় চেয়েছেন। আর সেই টানটান উত্তেজনার ডেডলাইনের মাঝেই নবান্নে শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে এক টেবিলে বসে পড়লেন একদিকে বিদ্রোহী ঋতব্রত, সন্দীপন, জাভেদরা এবং অন্যদিকে ববি হাকিম, কুণাল ঘোষ ও বজবজের বিধায়ক অশোক দেবরা।
রাজনৈতিক মহলের মতে, এর আগে কল্যাণীতে আয়োজিত নদিয়া, উত্তর ২৪ পরগনা ও হুগলি জেলার প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিয়ে বারাসতের হেভিওয়েট নেত্রী কাকলি ঘোষ দস্তিদার যেভাবে প্রকাশ্যেই দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন, ঠিক একই সুর এখন শোনা যাচ্ছে ফিরহাদ-কুণালদের গলাতেও। অথচ, ভোটে বিপর্যয়ের পর মঙ্গলবারই প্রথম বড় রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ধর্মতলায় ধর্নায় বসেছিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, যেখানে তাঁর পাশে হাতেগোনা যে কয়েকজন ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ফিরহাদ, নয়না ও অশোক দেবরা অন্যতম। কুণাল ঘোষও সেখানে গিয়েছিলেন, তবে পরে অসুস্থতার কারণে ফিরে আসেন। কিন্তু চব্বিশ ঘণ্টা কাটতে না কাটতেই সেই চেনা মুখগুলি নবান্নে শুভেন্দুর দরবারে হাজির হওয়ায় স্পষ্ট যে, কালীঘাটের রাশ এখন পুরোপুরি আলগা হয়ে গেছে।
এদিকে গত শনিবার দলের ‘ভোট-পরবর্তী হিংসায়’ নিহত কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার পথে সোনারপুরে মারাত্মক জনরোষের শিকার হয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। সেই ঘটনার পর থেকে তাঁকে আর জনসমক্ষে দেখা যায়নি, যা দলের নিচু তলার কর্মীদের মনোবল এক্কেবারে ভেঙে দিয়েছে। এই চরম সংকটের মুহূর্তে যখন দলের ভেতরেই ঋতব্রতর নেতৃত্বে এক বিশাল বিদ্রোহ আছড়ে পড়েছে, তখন ড্যামেজ কন্ট্রোলে মরিয়া হয়ে এক মরিয়া চাল চালল আদি তৃণমূল নেতৃত্ব।
বুধবার দুপুরে আচমকাই দলের পক্ষ থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ঘোষণা করা হয় যে, তৃণমূলের সমস্ত বর্তমান কমিটি এক লহমায় ভেঙে দেওয়া হলো! দাবি করা হয়েছে, কাজের মূল্যায়নের ভিত্তিতে নাকি নতুন কমিটি গড়া হবে। তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নতুন কমিটি গড়ার গল্প আসলে স্রেফ বাহানা; খোদ বিধানসভার অন্দরে ও নবান্নের বৈঠকে যেভাবে বিধায়করা লাইনে দাঁড়িয়ে দলনেত্রীকে ত্যাগ করছেন, তাতে তৃণমূলের এই ঐতিহাসিক ও চূড়ান্ত ভাঙন রোখা এখন আর কারও সাধ্যের মধ্যে নেই।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন