শেষ পর্যন্ত ফলতা বিধানসভা কেন্দ্রের মেগা পুনর্নির্বাচনের ফলাফলে ঘটে গেল এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক ওলটপালট। লোকসভা ভোটের আগে ঘাসফুল শিবিরের অহংকার ও দম্ভকে একেবারে চূর্ণ-বিচূর্ণ করে দিয়ে ফলতায় বইল বিপুল পদ্ম ঝড়। সমস্ত বুথফেরত সমীক্ষাকে ভুল প্রমাণ করে দিয়ে বিপুল জনসমর্থন নিয়ে রেকর্ড মার্জিনে জয়ী হলেন বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা। এই ঐতিহাসিক ফলাফলের পর খাস ডায়মন্ড হারবারের অন্দরেই চুরমার হয়ে গেল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বহু চর্চিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’।
বিজেপি প্রার্থীকে লক্ষাধিক ভোটে জেতানোর জন্য খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর করা আবেগময় আবেদনে যে ফলতাবাসী দু’হাত উজাড় করে সাড়া দিয়েছেন, এই নির্বাচনী ফলাফলই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। পুনর্নির্বাচনের ভোটগ্রহণের আগেই অবশ্য তৃণমূল প্রার্থী ‘পুষ্পা’ জাহাঙ্গির খান কার্যত রণে ভঙ্গ দিয়ে লড়াই থেকে সরে দাঁড়িয়েছিলেন, যার জেরে রাজনৈতিক চিত্রটা আগে থেকেই স্পষ্ট হতে শুরু করেছিল। কিন্তু গণনার দিন ইভিএম ও ব্যালট বাক্স খুলতেই যা সামনে এল, তা হয়তো খোদ তৃণমূল নেতৃত্বও কল্পনা করতে পারেননি। প্রথম রাউন্ডের গণনা শেষ হতেই ক্যানভাসে স্পষ্ট হয়ে ওঠে পদ্মফুলের দাপট। শুরুতেই ৯ হাজারেরও বেশি ভোটে এগিয়ে যান বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা, যেখানে জাহাঙ্গির পান মাত্র ২১০টি ভোট! গণনার প্রতিটা রাউন্ডে বাম-কংগ্রেসের থেকেও ক্রমাগত পিছিয়ে পড়তে পড়তে শেষ পর্যন্ত চার নম্বর স্থানে গিয়ে ঠেকে প্রাক্তন শাসকদলের হাল।
জামানত বাজেয়াপ্ত হয়ে এক নজিরবিহীন রাজনৈতিক লজ্জার মুখোমুখি হতে হলো একদা বাঘা নেতা জাহাঙ্গির শেখকে। নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বিজেপি প্রার্থী দেবাংশু পাণ্ডা মোট ভোট পেয়েছেন ১ লক্ষ ৪৯ হাজার ৬৬৬টি। তিনি তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী সিপিএমের শম্ভুনাথ কুর্মিকে ১ লক্ষ ৯ হাজার ২১ ভোটের এক বিশাল ও ঐতিহাসিক ব্যবধানে পরাজিত করেছেন। দীর্ঘ খরা কাটিয়ে এই কেন্দ্রে ৪০ হাজার ৬৪৫টি ভোট পেয়ে দ্বিতীয় প্রধান রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে উঠে এসেছে বামেরা। অন্যদিকে, তৃতীয় স্থানে থাকা হাত শিবিরের প্রার্থী আবদুর রজ্জাক মোল্লা পেয়েছেন ১০,০৮৪টি ভোট। আর সবাইকে চমকে দিয়ে মাত্র ৭,৭৮৩টি ভোট পেয়ে চতুর্থ স্থানে শেষ করেছেন তৃণমূল প্রার্থী জাহাঙ্গির। বিজেপির দেবাংশু পাণ্ডা তৃণমূল প্রার্থীকে ১ লক্ষ ৪১ হাজার ৮৮৩ ভোটের এক আকাশছোঁয়া মার্জিনে হারিয়ে ছাব্বিশের নির্বাচনের সমস্ত রেকর্ড ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন।
এই পুনর্নির্বাচনের দামামা বাজার পর তৃণমূলের ‘সেনাপতি’ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় অত্যন্ত চড়া সুরে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে সমাজমাধ্যমে লিখেছিলেন যে, ‘১০ জন্মেও বাংলা বিরোধী গুজরাট গ্যাং তাঁর ডায়মন্ড হারবার মডেলের সামান্য আঁচড় কাটতে পারবে না’। কিন্তু ফলতার ফল প্রকাশের পর অভিষেকের সেই অহংকারী হঙ্কার যে সম্পূর্ণ বিফলে গিয়েছে, তা নিয়ে কোমর বেঁধে ময়দানে নেমেছে বিজেপি।
খোদ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এই জয়ের পর কটাক্ষের সুরে সোশ্যাল মিডিয়ায় স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, অহংকারের পতন নিশ্চিত ছিল এবং তথাকথিত ‘ডায়মন্ড হারবার মডেল’ আজ থেকে আসলে ‘তৃণমূলের হার-বার মডেলে’ পরিণত হয়েছে। পুনর্নির্বাচনের আগে জাহাঙ্গির সরে দাঁড়ানোর পর প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার তাঁদের ভোটারদের বামেদের ভোট দেওয়ার যে পরোক্ষ আবেদন জানিয়েছিলেন, তা পুরোপুরি কাজ না করলেও, ফলতার মানুষ যে এবার একজোট হয়ে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেট রাজের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছেন, তা এই ফল থেকেই পরিষ্কার।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৪ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন