বর্ধমান: অতি সম্প্রতি সোনারপুরে গিয়ে সাধারণ মানুষের নজিরবিহীন বিক্ষোভের মুখে পড়তে হয়েছিল তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে, যেখানে তাঁকে লক্ষ্য করে আক্ষরিক অর্থেই আছড়ে পড়েছিল ডিমের বৃষ্টি। সেই ‘ডিম হামলার’ আতঙ্কে এবার এমন এক হাড়হিম করা কাণ্ড ঘটল বর্ধমানে, যা দেখে চোখ কপালে উঠেছে রাজনৈতিক মহলের।
কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নয়, বরং খোদ পুলিশি হেফাজত থেকে আদালতে তোলার সময় বর্ধমান দক্ষিণের প্রাক্তন তৃণমূল বিধায়ক খোকন দাসের মাথায় পরানো হলো শক্তপোক্ত হেলমেট! নতুন জমানায় ক্ষমতাচ্যুত নেতাদের বিরুদ্ধে আমজনতার যে মারাত্মক ক্ষোভ ও জনরোষের আগুন জ্বলছে, তা থেকে খোকনবাবুর মাথা বাঁচাতে পুলিশ যে বিন্দুমাত্র ঝুঁকি নিতে নারাজ— পুলিশের এই নজিরবিহীন পদক্ষেপেই তা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেছে।
একসময় পূর্বতন সরকারের আমলে বর্ধমানের এই হেভিওয়েট নেতার দাপট এবং প্রতিপত্তি দেখেছে গোটা জেলা। কিন্তু রাজ্যে ক্ষমতার অলিন্দে বদল আসতেই দিন কয়েক আগে উত্তরপ্রদেশের দীনদয়াল উপাধ্যায় স্টেশন থেকে খোকন দাসকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ট্রানজিট রিমান্ডে এদিন তাঁকে বর্ধমানে নিয়ে আসা হতেই যেন বাঁধভাঙা উল্লাসে ফেটে পড়ে স্থানীয় মানুষ। খোকনের গ্রেপ্তারির খবর চাউর হতেই বর্ধমান জুড়ে ‘খোকন চোর’ গান বাজিয়ে চলে নাচগান, বিলি করা হয় কিলো কিলো লাড্ডু, এমনকি আনন্দের চোটে সাধারণ মানুষ মেতে ওঠেন আগাম আবির খেলায়। এই প্রবল গণবিক্ষোভের আঁচ আঁচ করতে পেরেই এদিন আদালত চত্বরে কোনো ঝুঁকি নেয়নি পুলিশ। থমথমে নিরাপত্তার মধ্যে থানা থেকে বের করে খোকনকে যখন এজলাসের সামনে আনা হয়, তখন দেখা যায় কালো হেলমেটের আড়ালে নিজের মুখ পুরোপুরি লুকিয়ে চোরের মতো মাথা নিচু করে আদালতে ঢুকে যাচ্ছেন এই একদা বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খাওয়ানো নেতা।
বাম আমলেই প্রথম কাউন্সিলর হিসেবে রাজনৈতিক জীবন শুরু করা খোকন দাস ২০১৩ সালে পুরসভার ‘ডিফ্যাক্টো’ বা অলিখিত চেয়ারম্যান হয়ে ওঠার পর থেকেই উল্কার গতিতে তাঁর সম্পত্তি বাড়তে শুরু করে। বেআইনি বালি কারবার, চড়া সুদের ব্যবসা, বড় বড় ঠিকাদারি থেকে শুরু করে বেআইনি নির্মাণের মতো অজস্র মারাত্মক অপরাধের সঙ্গে তাঁর নাম জড়িয়েছিল।
কাঞ্চননগরে বলিউড তারকাদের এনে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে কাঞ্চন উৎসব করা এই নেতার আসল রূপ সামনে আসে ২০২১ সালের ভোট পরবর্তী হিংসার সময়। সেই সময় বর্ধমান শহরের বহু নিরীহ মানুষ ঘরছাড়া হন, যার প্রেক্ষিতে স্বয়ং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন তাঁদের রিপোর্টে খোকন দাসকে ‘নটোরিয়াস ক্রিমিনাল’ বা কুখ্যাত অপরাধী বলে দাগিয়ে দিয়েছিল। সিবিআই (CBI) তদন্তের জাল এতদিন এড়িয়ে চললেও, রাজ্যে সরকার বদলাতেই খোকনের বিরুদ্ধে ফের নতুন করে ভুরি ভুরি অভিযোগ জমা পড়ে। আর তাতেই গ্রেপ্তারির ভয়ে তড়িঘড়ি ভিনরাজ্যে পালালেও শেষ রক্ষা হলো না, ক্ষমতার অহংকার ধূলিসাৎ করে শেষমেশ শ্রীঘরেই ঠাঁই হলো এই প্রাক্তন বিধায়কের।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০২ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন