কল্যাণী: রাজ্য রাজনীতিতে এবার এক চরম ও নজিরবিহীন টুইস্ট! মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর প্রশাসনিক বৈঠকে যোগ দিতে সশরীরে পৌঁছে গেলেন তৃণমূলের হেভিওয়েট তথা ‘বিদ্রোহী’ সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার। শুধু কাকলিদেবীই নন, তাঁর সঙ্গে দেখা গিয়েছে শাসকদলের আরও দুই প্রভাবশালী বিধায়ককেও। কল্যাণীর এই হাই-ভোল্টেজ প্রশাসনিক বৈঠকে বিজেপির মন্ত্রী ও প্রথম সারির বিধায়কদের ভিড়ের মাঝে হঠাৎ তৃণমূলের এই জনপ্রতিনিধিদের উপস্থিতি ঘিরে বঙ্গে জোর রাজনৈতিক জল্পনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে দলের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়া বারাসতের এই সাংসদ ঠিক কী কারণে শুভেন্দুর দরবারে হাজির হলেন, তা নিয়ে এখন তোলপাড় চলছে বাংলার রাজনৈতিক অলিন্দে।
প্রশাসনিক সূত্রে জানা গিয়েছে, উত্তর ২৪ পরগনা, নদীয়া ও হুগলি— এই তিন জেলার সরকারি কাজকর্ম এবং সার্বিক সমস্যা সরেজমিনে খতিয়ে দেখতেই আজ কল্যাণীতে বিশেষ প্রশাসনিক বৈঠকের ডাক দেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। বৈঠক শুরুর আগেই সেখানে একে একে পৌঁছে যান দিলীপ ঘোষ, অগ্নিমিত্রা পালের মতো বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্বরা এবং নিয়ম মেনে মুখ্যমন্ত্রীকে গার্ড অফ অনার দিয়ে স্বাগত জানানো হয়। কিন্তু সব আলো কেড়ে নেয় যখন সাতসকালে সেই বৈঠকস্থলে পা রাখেন তৃণমূল সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার এবং তাঁর ঠিক পেছনেই দেখা যায় দেগঙ্গা ও স্বরূপনগরের দুই তৃণমূল বিধায়ককে। অবশ্য কিছুদিন আগে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে সরকারি কাজে বিরোধীদেরও ডাকা হতে পারে, তবে আজ দলীয় কোন্দলের আবহে এই দুই শিবিরের একাসনে বসা নিছকই প্রশাসনিক নাকি এর পেছনে গভীর কোনো রাজনৈতিক খেলা রয়েছে, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত কোনো পক্ষই মুখ খোলেনি।
কাকলি ঘোষ দস্তিদারের এই পদক্ষেপকে রাজনৈতিক মহল কিন্তু একেবারেই হালকাভাবে নিচ্ছে না। কারণ, গত ১৫ মে লোকসভায় তৃণমূলের সংসদীয় দলের মুখ্য সচেতক পদ থেকে বারাসতের এই সাংসদকে আচমকাই সরিয়ে দেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সেই জায়গায় আনা হয় শ্রীরামপুরের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়কে। এই ঘটনার ঠিক পরদিনই ফেসবুকে বিস্ফোরক পোস্ট করে নিজের তীব্র অভিমান উগরে দিয়েছিলেন মমতার এই দীর্ঘদিনের বিশ্বস্ত সৈনিক। কাকলি লিখেছিলেন, “৭৬ থেকে পরিচয়, ৮৪-তে পথ চলা শুরু। চার দশকের আনুগত্যের জন্য আজ পুরস্কৃত হলাম।” এরপর থেকেই একের পর এক বিষয়ে বিদ্রোহী হয়ে ওঠেন তিনি। ভোটকুশলী সংস্থা আই-প্যাক নিয়ে সুব্রত বক্সীকে চিঠি লেখা থেকে শুরু করে স্বয়ং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি কটাক্ষ করা— কোনো কিছুই বাকি রাখেননি চার দশকের এই পুরনো নেত্রী।
উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে ছাত্র রাজনীতির হাত ধরে মমতা ও কাকলির সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল এবং ১৯৮৪ সালে মমতার রাজনৈতিক উত্থানের সময় থেকেই তাঁর ছায়াসঙ্গী ছিলেন কাকলি। গত বছর কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এই সচেতক পদ থেকে সরে দাঁড়ালে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল কাকলিকে। কিন্তু বিধানসভা ভোটে তৃণমূলের ভরাডুবির পর দল যখন কোণঠাসা, তখন লোকসভায় দলের হয়ে আরও বেশি আক্রমণাত্মক ভূমিকা নেওয়ার জন্য কল্যাণকে পুনরায় ওই গুরুত্বপূর্ণ পদে ফিরিয়ে আনা হয়। আর দলনেত্রীর এই সিদ্ধান্তকে কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি কাকলি। এবার সমস্ত ক্ষোভ উগরে দিয়ে খোদ শুভেন্দু অধিকারীর হাই-প্রোফাইল বৈঠকে তাঁর পৌঁছে যাওয়া বঙ্গে এক নতুন রাজনৈতিক উলটপুরাণের স্পষ্ট ইঙ্গিত বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন