"আমাদের বা ফ্রান্সের কোনো খেলোয়াড়ই এই ম্যাচটা খেলতে চায় না," সেমিফাইনালের স্বপ্নভঙ্গের পর অকপটে স্বীকার করেছেন ইংল্যান্ডের ম্যানেজার থমাস টুখেল।
একই সুর ফ্রান্সের কোচ দিদিয়ে দেশঁ-র কণ্ঠেও, "ইংল্যান্ড যেমন খেলতে চায় না, আমরাও চাই না।"
সবেমাত্র চোখের সামনে তাদের শ্রেষ্ঠত্বের স্বপ্ন ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। এখন অমরত্বের ফাইনালে ওঠার প্রস্তুতির বদলে, ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সকে ব্যাগ গুছিয়ে মিয়ামির বিমানে উঠতে হচ্ছে... স্রেফ ব্রোঞ্জ পদকের লড়াইয়ের জন্য!
এটিই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। প্রশাসনিক যুক্তি আর টেলিভিশনের সম্প্রচার স্বত্বের লোভে তৈরি হওয়া এই ম্যাচে অংশ নিতে হয় গভীর মানসিক ধাক্কায় থাকা ফুটবলারদের।
ইংল্যান্ড কিংবা ফ্রান্স—কেউই মাঠে নামতে রাজি নয়। প্লেয়ারদের বুকভাঙ্গা কান্না। কিন্তু ফিফার সবচেয়ে ‘অস্বস্তিকর’ এই ম্যাচের একটি গোপন সত্য আছে: এটিই আসলে বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিনোদনমূলক খেলা।কারণ ইতিহাস বলছে, যখনই ফাইনালের পাহাড়প্রমাণ চাপ মাথা থেকে নেমে যায়, তখনই মাঠে জাদুকরী কিছু ঘটে।
বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচগুলো সাধারণত চরম উত্তেজনাপূর্ণ, রক্ষণাত্মক এবং কৌশলী দাবা খেলার মতো হয়। কিন্তু এই সান্ত্বনার ম্যাচটি হয় একদম উন্মুক্ত ও আক্রমণাত্মক। হারানোর কিছু না থাকায় দলগুলো কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই অল-আউট ফুটবল খেলে।
১৯৩৪ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে খেলা ২০টি প্লে-অফ ম্যাচের অবিশ্বাস্য পরিসংখ্যানই তার প্রমাণ।
বিশ্বকাপের ইতিহাসের এমন কিছু রেকর্ড আছে যা ফাইনালে নয়, বরং এই "অবাঞ্ছিত" ম্যাচেই তৈরি হয়েছিল:
১৯৫৮ সালের তৃতীয় স্থানের ম্যাচে ফ্রান্সের জুস্ত ফন্তেইন একাই ৪টি গোল করেন। এর মাধ্যমে এক বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ ১৩ গোলের এমন এক রেকর্ড তিনি গড়েন, যা ভাঙা আজ অবধি অসম্ভব।
১৯৯৮ সালে ক্রোয়েশিয়ার ডাভর সুকের এই ম্যাচে নিজের ষষ্ঠ গোলটি করে বিশ্বের বাঘা বাঘা স্ট্রাইকারদের পেছনে ফেলে এককভাবে গোল্ডেন বুট লুফে নেন।
২০০২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে তুরস্কের হাকান শুকুর মাত্র ১১ সেকেন্ডে গোল করেছিলেন। এটি আজও পুরুষ বিশ্বকাপের ইতিহাসের দ্রুততম গোল।
যদিও ইংল্যান্ড বা ফ্রান্সের মতো ফুটবল পরাশক্তিদের কাছে তৃতীয় হওয়াটা হয়তো সান্ত্বনা পুরস্কারের মতোই শোনায়। ইংল্যান্ড দুবার (১৯৯০ এবং ২০১৮) চেষ্টা করেও ব্রোঞ্জ জিততে পারেনি। অন্যদিকে ফ্রান্স তিনবারের মধ্যে দুবার জিতেছে। কিন্তু বাকি বিশ্বের কাছে এটি তাদের জীবনের সবচেয়ে বড় ম্যাচ।
১৯৯৮ এবং ২০২২ সালে ক্রোয়েশিয়া যখন ব্রোঞ্জ জিতেছিল, কিংবা ২০০২ সালে তুরস্ক যখন তৃতীয় হয়েছিল—সেটি তাদের কাছে কোনো সান্ত্বনা ছিল না, ছিল জাতীয় উৎসব! তাদের দেশের ফুটবল ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ গৌরব গাঁথা লেখা হয়েছিল ওই ম্যাচেই।
উয়েফা (UEFA) কয়েক দশক আগেই ইউরো কাপ থেকে এই ম্যাচটি বাদ দিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ফিফা (Fifa) ২০২৬ সালের ৪৮ দলের মেগা বিশ্বকাপেও একে টিকিয়ে রেখেছে।
টুখেল বা দেশঁ মিয়ামির ফ্লাইট নিয়ে যতই অসন্তোষ প্রকাশ করুন না কেন, ইতিহাস বলে—রেফারির বাঁশি বাজার সাথে সাথেই ফুটবলারদের ভেতরের জেদ জেগে ওঠে।
তাই গোল আর ড্রামার জন্য প্রস্তুত থাকুন। ব্রোঞ্জের এই লড়াইকে মোটেও হালকাভাবে নেবেন না।

শনিবার, ১৮ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ জুলাই ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন