কলকাতা: বাংলার রাজনৈতিক ইতিহাসে আজ হয়তো সবথেকে বড় মহাবিস্ফোরণের দিন! দীর্ঘদিনের জল্পনা ও পর্দার পিছনের সমীকরণকে সত্যি করে বুধবার এক্কেবারে আক্ষরিক অর্থেই ভেঙে চুরমার হয়ে যাওয়ার মুখে দাঁড়িয়ে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমস্ত নিয়ন্ত্রণ এবং চাণক্য নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে আজ বিধানসভায় এক অভূতপূর্ব কাণ্ড ঘটিয়ে দিলেন বহিষ্কৃত নেতা তথা বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। এক-দু’জন নয়, খোদ শাসকদলের ৫৯ জন বিধায়কের সই সংবলিত একটি অত্যন্ত শক্তিশালী চিঠি নিয়ে সটান বিধানসভায় প্রবেশ করলেন তিনি। আর এই দুর্ধর্ষ চাঞ্চল্যকর পদক্ষেপের পরেই রাজ্য রাজনীতিতে প্রশ্ন উঠে গেছে— তবে কি আজই আনুষ্ঠানিক আত্মপ্রকাশ ঘটতে চলেছে ‘নতুন তৃণমূল’-এর? মমতাপন্থী শিবিরের হাত থেকে কি তবে ঘাসফুল প্রতীকও হাতছাড়া হতে চলেছে?
তৃণমূলের অন্দরে এতদিন যে ক্ষোভের লাভা ফুটছিল, তা আজ এক লহমায় প্রকাশ পেয়ে গেছে। ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সন্দীপন সাহার নেতৃত্বাধীন এই ‘নতুন তৃণমূল’ শিবিরে যোগ দিয়েছেন দলের একঝাঁক বর্ষীয়ান হেভিওয়েট এবং জেলাস্তরের অত্যন্ত প্রভাবশালী নেতৃত্ব। দল ভাঙার এই তালিকায় সবথেকে বড় নাম হিসেবে সামনে আসছেন রাজ্যের একাধিক প্রাক্তন ও বর্তমান প্রভাবশালী মন্ত্রী এবং বর্ষীয়ান নেতা। দলত্যাগী বিধায়কদের এই তালিকায় উজ্জ্বল নাম হিসেবে রয়েছেন সুজাপুরের বিধায়ক সাবিনা ইয়াসমিন, হাবড়ার বিধায়ক রথীন ঘোষ, বোলপুরের চন্দ্রনাথ সিনহা এবং হাওড়া মধ্যের অতি পরিচিত দাপুটে নেতা তথা বিধায়ক অরূপ রায়। মন্ত্রীদের এই ঝাঁকের পাশাপাশি ডোমজুড়ের বিধায়ক তাপস মাইতি এবং মহেশতলার শুভাশিস দাসের মতো দক্ষিণবঙ্গের নেতারাও দলত্যাগের লাইনে শামিল হয়েছেন।
দক্ষিণবঙ্গের পাশাপাশি উত্তরবঙ্গ ও জঙ্গলমহলের জেলাগুলিতেও তৃণমূলের সংগঠনে এক বিশাল ধস নেমেছে। মুর্শিদাবাদ জেলায় একযোগে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন সামসেরগঞ্জের বিধায়ক মহম্মদ নূর আলম, হরিহরপাড়ার নিয়ামত শেখ, সুতির ইমানি বিশ্বাস, রঘুনাথগঞ্জের আক্রুজ্জামান এবং লালগোলার বিধায়ক আব্দুল আজিজ, যিনি সম্পর্কে আবার প্রভাবশালী এনামুল হকের জামাই। এছাড়াও ভগবানগোলার রেয়াত হোসেনের মতো সংখ্যালঘু মুখেরাও ঋতব্রতের হাত ধরেছেন। ওদিকে মালদার রতুয়ার বিধায়ক সমর মুখোপাধ্যায়, পশ্চিম মেদিনীপুরের খড়্গপুরের দিনেন রায়, কেশপুরের শিউলি সাহা এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনার কুলপির বিধায়ক বর্ণালী ধারা ও পাথরপ্রতিমার সমীর দানাও এই নতুন শিবিরে সই করে দিয়েছেন। তালিকায় রয়েছেন হাওড়া জেলার আরও তিন বিধায়ক, যার মধ্যে অরুণাভ সেন এবং সমীর পাঁজাও আছেন বলে খবর।
রাজনৈতিক মহলের মতে, দলত্যাগ বিরোধী আইনকে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙুল দেখাতেই অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি বিধায়কের সমর্থন নিয়ে এই চাল চেলেছে ঋতব্রত শিবির। তবে এখানে সবথেকে বড় টুইস্ট হলো, এই বিদ্রোহী বিধায়কদের প্রত্যেকেই এখনও মুখে বলছেন যে তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কেই নিজেদের সর্বোচ্চ নেত্রী হিসাবে মানছেন! কিন্তু একই সঙ্গে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কাছে এটা জলের মতো স্পষ্ট যে, মমতা ও অভিষেকের কড়া শাসন ব্যবস্থা এবং দলের রাশ ভেঙে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে বেরিয়ে এসেছেন এই ৫৯ জন বিধায়ক। বিধানসভায় এবার এই ‘নতুন তৃণমূল’ই প্রধান বিরোধী দলের তকমা পেতে চলেছে কি না, তা নিয়ে সিলমোহর পড়া এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। তবে এই নতুন জোটের ‘বিরোধী দলনেতা’ হিসেবে কার নাম সামনে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে আপাতত রহস্যময় মুচকি হাসিতে মুখে কুলুপ এঁটেছেন ঋতব্রত থেকে শুরু করে অরূপ রায়রা।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৩ জুন ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন