ঝাড়গ্রাম: সামান্য এক ঠোঙা ঝালমুড়ি যে মানুষের জীবন এভাবে ওলটপালট করে দিতে পারে, তা বোধহয় অতিবড় গল্পকারও কল্পনা করতে পারবেন না। ঝাড়গ্রাম শহরের রাজ কলেজ মোড়ের চেনা ছবিটা গত ১৯ এপ্রিলের পর থেকে আর পাঁচটা সাধারণ দিনের মতো নেই। আর পাঁচটা ছাপোষা যুবকের মতোই নিজের ‘চবনলাল স্পেশ্যাল ঝালমুড়ি’র দোকানে মুড়ি-চানাচুর গোছাতে ব্যস্ত থাকেন বিক্রমকুমার সাউ। কিন্তু আজ তাঁর দোকানের সামনে চেনা খদ্দেরদের ভিড়ের চেয়েও বেশি নজর কাড়ে উর্দিধারী পুলিশ আর সিসিটিভি ক্যামেরা। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর দোকান থেকে মাত্র ১০ টাকার ঝালমুড়ি কিনে খেয়েছিলেন, আর সেই এক টুকরো ঘটনাই রাতারাতি বিক্রমকে এনে দাঁড় করিয়েছে এক অদ্ভুত ও আতঙ্কের দোলাচলে। ভোট মিটেছে, নতুন সরকারও গঠিত হয়েছে, কিন্তু ঝাড়গ্রামের এই ঝালমুড়িওয়ালার জীবন থেকে আতঙ্কের মেঘ এখনও কাটেনি। বিক্রমের গলায় আজ স্পষ্ট আক্ষেপ, মোদী তাঁর দোকানে না এলেই হয়তো ভাল হত!
প্রধানমন্ত্রীর কনভয় হঠাৎ থমকে গিয়েছিল তাঁর দোকানের সামনে। না, আগে থেকে কোনও পরিকল্পনা ছিল না, ছিল না কোনও প্রস্তুতিও। আচমকাই দেশের ভিভিআইপি মানুষটি তাঁর হাতে তৈরি ঝালমুড়ি চেখে দেখেন। মোদীর দেওয়া সেই ঐতিহাসিক ১০ টাকার নোটটি বিক্রম আজও সযত্নে আলমারিতে তুলে রেখেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই ১০ টাকাই যেন তাঁর জীবনের শান্তি কেড়ে নিয়েছে। ঘটনার পর থেকেই শুরু হয়েছে একের পর এক উড়ো ফোন আর বার্তা। বিক্রমের দাবি, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ থেকে প্রতিনিয়ত টেক্সট মেসেজ এবং হোয়াটস্অ্যাপে হুমকি দেওয়া হচ্ছে তাঁকে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, ঝাড়গ্রাম থানায় অভিযোগ জানানোর পর এখন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত কড়া পুলিশি পাহারায় দোকান চালাতে হচ্ছে তাঁকে।
আদতে বিহারের গয়ার বাসিন্দা সাউ পরিবার গত ২০ বছর ধরে ঝাড়গ্রামে আছেন। পাঁচ লক্ষ টাকা ঋণ নিয়ে ফুটপাথের ঠেলাগাড়ি ছেড়ে কলেজ মোড়ে এই স্থায়ী দোকানটি করেছিলেন বিক্রম। বাবা, মা, স্ত্রী আর পাঁচ বছরের সন্তানকে নিয়ে সুখের সংসার চালাতে গিয়ে এখন প্রতি মুহূর্তে তাড়া করে বেড়াচ্ছে এক অজানা ভয়। বিক্রম স্পষ্ট জানালেন, রাজনৈতিক টানাপোড়েনের শিকার হতে হয়েছে তাঁকে। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দোকানে খাওয়ায় একদল মানুষ তাঁকে ‘বিজেপির লোক’ বলে দাগিয়ে দিয়েছে। এমনকি বিক্রমের অকপট স্বীকারোক্তি, রাজ্যে যদি সরকার বদল না হত, তবে হয়তো এই আতঙ্ক সহ্য করতে না পেরে পাততাড়ি গুটিয়ে সপরিবারে বিহারেই ফিরে যেতে হত তাঁদের।
আজ বিক্রমের দোকানে ঝালমুড়ি খেতে গেলেও আগে জবাবদিহি করতে হয় পাহারারত পুলিশকর্মীকে। প্রতিবেশী রুনা ভকতের কথায়, সাউ পরিবার ভীষণ ভালো ও শান্ত স্বভাবের। কিন্তু মোদী আসার পর থেকে পাড়ায় অচেনা মানুষের আনাগোনা এবং ভিড় বড্ড বেড়ে গিয়েছে। মুখে স্মিত হাসি ধরে রাখলেও বিক্রমের চোখেমুখে এখন কেবলই চাপা আতঙ্ক। নিরাপত্তার ঘেরাটোপে থেকেও বুক ফেটে বেরোচ্ছে একটাই আর্তনাদ, এই চেনা জীবনটা বড্ড অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ১০ টাকার ঝালমুড়ি খবরের শিরোনামে এনে দিলেও, এক লহমায় কেড়ে নিয়েছে এক সাধারণ বিক্রেতার মানসিক স্বস্তি।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন