রোহতক: সাধারণ বন্দিদের ক্ষেত্রে যেখানে পর্যাপ্ত কারণ ও বহু কাঠখড় পোড়ানোর পরও প্যারোল বা ছুটি মেলা দায়, সেখানে খুন ও ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত গুরমিত রাম রহিম সিংয়ের জন্য যেন আইনের নিয়মটাই আলাদা! চলতি বছরের জানুয়ারি মাসেই ৪০ দিনের ছুটি কাটিয়ে জেলখানায় ফিরেছিলেন ডেরা সচ্চা সৌদার এই বিতর্কিত প্রধান।
কিন্তু তার মাত্র ৪ মাস কাটতে না কাটতেই ফের একবার মিলল সরকারি দাক্ষিণ্য। মঙ্গলবার হরিয়ানার রোহতকের সুনিয়া জেল থেকে আরও ৩০ দিনের প্যারোলে মুক্তি পেয়ে কড়া নিরাপত্তায় জেলের বাইরে এলেন ‘ধর্ষক বাবা’। এই নিয়ে বিগত পাঁচ বছরে মোট ১৬ বার জেল থেকে ছুটি মঞ্জুর হলো তাঁর, যা নিয়ে এই মুহূর্তে দেশের বিচারব্যবস্থা ও রাজনৈতিক মহলে এক চরম বিতর্ক ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
সরকারি খতিয়ান বলছে, ৫৭ বছরের এই স্বঘোষিত ধর্মগুরু খাতায়-কলমে দীর্ঘ মেয়াদে জেলবন্দি হলেও কার্যত সরকারের বিশেষ বাদান্যতায় তাঁর বছরের বেশির ভাগ সময়টাই কাটছে জেলের বাইরে বিলাসবহুল ডেরায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের জানুয়ারি মাসে প্রথমে ২০ দিনের প্যারোল, তারপর এপ্রিলে ২১ দিন এবং আগস্ট মাসে এক ধাক্কায় ৪০ দিনের প্যারোলে মুক্তি দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। শুধু তাই নয়, ২০২০ সাল থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এই ৫ বছরের মধ্যে মোট ৩২৬ দিনই তিনি জেলের বাইরে কাটিয়েছেন। ২০২৬ সালের শুরুতে জানুয়ারি মাসে ৪০ দিনের মেগা ছুটি কাটানোর পর এবার ফের ৩০ দিনের ছুটি পাওয়ায়, মঙ্গলবার সকাল সাড় ৬টা নাগাদ তিনি সিরসায় নিজের ডেরার উদ্দেশে রওনা দেন। আইনের চোখকে কার্যত বুড়ো আঙুল দেখিয়ে একজন অপরাধীর এই অবাধ বিচরণের নেপথ্যে গভীর কোনো রহস্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে সরব হয়েছেন অনেকেই।
উল্লেখ্য, ২০১৭ সালে ডেরা আশ্রমের ভেতরেই দুই শিষ্যাকে ধারাবাহিক ধর্ষণের দায়ে নিম্ন আদালতে দোষী সাব্যস্ত হয়ে ২০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের সাজা খাটছেন এই স্বঘোষিত ধর্মগুরু। এ ছাড়াও, ২০০২ সালে ডেরার রাজ্য কমিটির সদস্য রণজিৎ সিংকে নৃশংসভাবে খুন করার মামলাতেও নিম্ন আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল। যদিও গত মে মাসে পাঞ্জাব ও হরিয়ানা হাইকোর্ট পর্যাপ্ত প্রমাণের অভাবে রণজিৎ সিং খুনের মামলা থেকে রাম রহিমকে বেকসুর খালাস করে দেয়। তবে ধর্ষণের মতো সংবেদনশীল ও গুরুতর মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হওয়ার পরেও কীভাবে একজন অপরাধী এতবার রাজকীয়ভাবে প্যারোল পেয়ে যান, সেই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ধর্মগুরুর এই ঘন ঘন প্যারোলে মুক্তি নিয়ে বারবার নানা মহলে প্রশ্ন উঠেছে এবং এর পেছনে ভারতের নোংরা ‘ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি’ জড়িয়ে রয়েছে বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। অভিযোগ, হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ এবং রাজস্থানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে রাম রহিমের ডেরার লক্ষ লক্ষ অন্ধ ভক্ত তথা একনিষ্ঠ ভোটার রয়েছে। আর এই বিশাল ভোটব্যাঙ্ককে নিজেদের দিকে টানতেই রাজনৈতিক দলগুলি এবং সরকার তাঁকে দফায় দফায় এই বিশেষ আইনি সুবিধা পাইয়ে দেয়। বিশেষ করে ওই রাজ্যগুলিতে কোনো নির্বাচন এগিয়ে এলেই রাম রহিমের প্যারোলের ফাইল অদ্ভুতভাবে দ্রুত ছাড়পত্র পেয়ে যায়, যা ভারতীয় গণতন্ত্রের এক অন্ধকার দিককেই বারবার বিশ্বের দরবারে প্রকাশ করে দিচ্ছে।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ মে ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন