নয়াদিল্লী: ভারতের মানচিত্র নিয়ে আমেরিকার রহস্যময় আচরণ এবং পাকিস্তানের নির্লজ্জ দৌড়ঝাঁপ আবারও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক অস্বস্তিকর অধ্যায়ের জন্ম দিল। সম্প্রতি মার্কিন বাণিজ্য প্রতিনিধির (USTR) দফতর থেকে প্রকাশিত ভারতের একটি মানচিত্রে সমগ্র জম্মু-কাশ্মীর, পাক অধিকৃত কাশ্মীর (PoK) এবং আকসাই চিনকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে দেখানো হয়েছিল। কিন্তু ইসলামাবাদের তরফে নালিশের ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই সেই পোস্ট মুছে ফেলে কার্যত পিছু হটল ট্রাম্প প্রশাসন। প্রশ্ন উঠেছে, ওয়াশিংটন কি তবে ভারতের সার্বভৌমত্বের চেয়ে পাকিস্তানের তথাকথিত ‘আবেগ’ এবং চিনের ‘দাবি’কে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে?
গত ৭ ফেব্রুয়ারি ভারত ও আমেরিকার মধ্যে এক ঐতিহাসিক অন্তর্বর্তী বাণিজ্য-সমঝোতা স্বাক্ষরিত হয়। সেই সাফল্যের খতিয়ান দিতেই মার্কিন প্রশাসন ভারতের একটি মানচিত্র প্রকাশ করে। তাতে হলুদ রেখায় ভারতের প্রকৃত এবং ঐতিহাসিক সীমান্তকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। নয়াদিল্লি বরাবরই আন্তর্জাতিক মঞ্চে স্পষ্ট করে দিয়েছে, ১৯৪৭ সাল থেকে পাকিস্তান অবৈধভাবে কাশ্মীরের একটি অংশ দখল করে রেখেছে এবং আকসাই চিনও লাদাখেরই অংশ। ফলে আমেরিকার সেই মানচিত্রটি ছিল সত্যের প্রতিফলন।
যদিও, ভারতের অখণ্ডতার এই স্বীকৃতি সহ্য করতে পারেনি ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি আর রাজনৈতিক অস্থিরতায় জর্জরিত পাকিস্তান। তড়িঘড়ি আসরে নামেন পাক বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি। তাঁর দাবি, আমেরিকা নাকি ‘ভুল’ স্বীকার করে নিয়েছে। ইসলামাবাদের চাপে পড়ে পোস্টটি মুছে ফেলায় প্রশ্ন উঠছে আমেরিকার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে। একদিকে যখন তারা ভারতকে ‘কৌশলগত পরম মিত্র’ হিসাবে দাবি করে, অন্যদিকে পাকিস্তানের মতো একটি দেশের আপত্তিতে ভারতের পূর্ণাঙ্গ মানচিত্র সরিয়ে নেওয়া কি মার্কিন দ্বিচারিতারই নামান্তর নয়?
ভারতের কূটনৈতিক মহলের মতে, ভারত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। তার মানচিত্র বা ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষার জন্য হোয়াইট হাউসের ‘সার্টিফিকেট’ বা সিলমোহরের প্রয়োজন নেই। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপ থেকে দুটি বিষয় স্পষ্ট। প্রথমত, আমেরিকা মুখে ভারতকে সমর্থনের কথা বললেও, কাজের ক্ষেত্রে তারা আজও রাষ্ট্রসংঘের সেই পুরনো ও অচল মানচিত্রের দোহাই দিয়ে বিতর্ক জিইয়ে রাখতে চায়। দ্বিতীয়ত, পিওকে-কে ভারতের অংশ হিসাবে দেখানোয় ইসলামাবাদের যে কম্পন শুরু হয়েছে, তা প্রমাণ করে যে তারা নিজেদের দখলের অবৈধতা সম্পর্কে কতটা ভীত।
পাক মুখপাত্র আন্দ্রাবি রাষ্ট্রসংঘের ওয়েবসাইটের দোহাই দিয়ে যে বিতর্কিত মানচিত্রের কথা বলেছেন, তা আসলে ভারতের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটকে অস্বীকার করার এক ব্যর্থ চেষ্টা। সিমলা চুক্তি থেকে শুরু করে একাধিক দ্বিপাক্ষিক আলোচনায় ভারত স্পষ্ট করেছে, কাশ্মীর সমস্যা সমাধানে তৃতীয় পক্ষের (রাষ্ট্রসংঘ বা আমেরিকা) কোনও স্থান নেই।
তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মতে, এই প্রেক্ষাপটে পোস্ট মুছে দিয়ে আমেরিকা হয়তো সাময়িকভাবে পাকিস্তানকে শান্ত করেছে, কিন্তু এতে ভারতের অবস্থানের কোনও পরিবর্তন হবে না। নরেন্দ্র মোদী সরকার একাধিকবার জানিয়েছে, ‘পিওকে’ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল, আছে এবং থাকবে। ওয়াশিংটনের এই পিছু হটা ভারতের জন্য কোনও কূটনৈতিক হার নয়। বরং, এটি আমেরিকার জন্য একটি সুযোগ হারানো — যেখানে তারা দক্ষিণ এশিয়ায় সত্যের পক্ষে দাঁড়িয়ে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে পারত।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন