শিলিগুড়ি: বাংলাদেশের চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে উত্তর-পূর্ব ভারতের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ চিকেন’স নেক করিডর নতুন করে আলোচনায় এসেছে। আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, এই করিডরে অস্থিরতা তৈরি হলে তা কিছু ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থানকে শক্তিশালী করতে পারে। তবে একই সঙ্গে ভারতের পক্ষ থেকেও স্পষ্ট বার্তা—চিকেন’স নেকের পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, কোনও ঝুঁকি নেওয়া হবে না এবং প্রস্তুতি সর্বোচ্চ স্তরেই থাকবে।
চিকেন’স নেক করিডর ভারতের মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে উত্তর-পূর্ব ভারতের একমাত্র স্থল সংযোগ। এই করিডরে সামান্য চাপ বা অস্থিরতাও উত্তর-পূর্ব ভারতের যোগাযোগ, সরবরাহ ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার উপর প্রভাব ফেলতে পারে। কৌশলগতভাবে এই অবস্থান বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ করিডরটি বাংলাদেশের উত্তর সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতার সময় এই করিডর ঘিরে উত্তেজনা তৈরি হলে তা আন্তর্জাতিক মহলে ভারতের উপর কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাগত চাপ বাড়াতে পারে। একই সঙ্গে সীমান্ত ব্যবস্থাপনা জটিল হয়ে উঠলে বাংলাদেশ আঞ্চলিক সমীকরণে নিজেদের দরকষাকষির অবস্থান শক্ত করতে পারে বলেও মত অনেকের।
বিশেষ করে রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় সীমান্ত এলাকায় অনিশ্চয়তা বাড়লে, তা পরোক্ষভাবে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের উপর চাপ সৃষ্টি করতে পারে—এই বাস্তবতাকে কাজে লাগানোর কৌশল অতীতেও বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি গ্রহণ করেছে বলে বিশ্লেষকদের বক্তব্য।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক আন্দোলন, বিক্ষোভ, প্রশাসনিক অচলাবস্থা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির ফলে সীমান্তবর্তী এলাকায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই ধরনের পরিস্থিতিতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, চোরাচালান ও সীমান্ত অপরাধ বৃদ্ধির আশঙ্কা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়। ফলত, চিকেন’স নেক করিডরের মতো সংবেদনশীল অঞ্চলের উপর নজর আরও বেড়ে যায়।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি কোনও পদক্ষেপ না নিলেও সীমান্তে অস্থির পরিবেশ তৈরি হওয়াই একটি কৌশলগত সুবিধা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এই কারণেই চিকেন’স নেক ঘিরে যেকোনও অস্থিরতা আঞ্চলিক রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট। সশস্ত্র সীমা বল (SSB)-এর ডিরেক্টর জেনারেল সঞ্জয় সিংহল জানিয়েছেন, চিকেন’স নেক করিডর ও সংলগ্ন সীমান্ত এলাকায় বর্তমান মোতায়েন ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যাপ্ত। গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং সীমান্ত বাহিনী সম্পূর্ণ প্রস্তুত।
ভারতের কৌশলগত নীতিতে চিকেন’স নেক ‘নো-ফেইল জোন’ হিসেবে বিবেচিত। অর্থাৎ, পরিস্থিতি যাই হোক না কেন—রাজনৈতিক অস্থিরতা, সীমান্ত চাপ বা কূটনৈতিক উত্তেজনা—এই করিডরের নিরাপত্তায় কোনও ছাড় দেওয়া হবে না। সেই কারণেই অতিরিক্ত নজরদারি, প্রযুক্তিনির্ভর পর্যবেক্ষণ এবং বহুস্তরীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা বজায় রাখা হয়েছে।
একদিকে যেখানে ভারত কূটনৈতিক স্তরে প্রতিবেশী দেশগুলির সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে, অন্যদিকে নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে রাখা হয়েছে। ইন্দো–নেপাল ফ্রেন্ডশিপ ট্রিটি, ১৯৫০ কার্যকর রেখে সীমান্তে স্বাভাবিক যাতায়াত বজায় রাখার পাশাপাশি নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়গুলিতে কঠোর অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারত কোনও প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং আগাম প্রস্তুতির নীতিতেই এগোচ্ছে। চিকেন’স নেক করিডরের ক্ষেত্রে এই নীতিই ভারতের কৌশলগত শক্তির অন্যতম দিক।
বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা আঞ্চলিক নিরাপত্তা সমীকরণে নতুন মাত্রা যোগ করলেও, চিকেন’স নেক করিডর নিয়ে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট ও কঠোর। সীমান্তে অস্থিরতা তৈরি হওয়া কারও পক্ষেই দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক নয়—এই বার্তাই নিরাপত্তা ও কূটনৈতিক মহলের তরফে দেওয়া হচ্ছে।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন