কলকাতা: আগামী দিনে পশ্চিমবঙ্গের চেনা রাজনৈতিক ভূগোল কি ইতিহাস হয়ে যাওয়ার পথে? লোকসভা ও বিধানসভার আসন পুনর্বিন্যাস বা ‘ডিলিমিটেশন’ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সদ্য বিল পেশের পর এই প্রশ্ন নিয়েই এখন বাংলার রাজনৈতিক মহলে কাটাছেঁড়া চলছে। মোদী সরকারের প্রস্তাবিত নয়া ফর্মুলা অনুযায়ী, লোকসভায় বাংলার আসন সংখ্যা ৪২ থেকে বেড়ে হতে পারে ৬৩। অন্যদিকে, বিধানসভার আসন সংখ্যা ২৯৪ থেকে একলাফে বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪৪১-এ। সংখ্যার এই ব্যাপক বৃদ্ধি আপাতদৃষ্টিতে রাজ্যের ক্ষমতা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দিলেও, এর গভীরে লুকিয়ে আছে এক জটিল রাজনৈতিক ও জনতাত্ত্বিক সমীকরণ।
কেন্দ্রীয় সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, লোকসভার মোট আসন সংখ্যা ৫৪৩ থেকে বাড়িয়ে ৮৫০ করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৮১৫টি আসন রাজ্যগুলির জন্য বরাদ্দ। এই সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে যদি ‘প্রো-রাটা’ বা বর্তমান আসনের নিরিখে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধির সূত্র মানা হয়, তাহলে বাংলার সংসদীয় শক্তি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে। একইভাবে বিধানসভার আসন সংখ্যাও বর্তমানের তুলনায় প্রায় দেড় গুণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, সেক্ষেত্রে বর্তমান ৪২টি আসনের সঙ্গে আরও ২১টি আসন যুক্ত হবে।
আসন পুনর্বিন্যাসের এই প্রক্রিয়া ঘিরে পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা দুটি প্রধান উদ্বেগের কথা বলছেন। যথা -
১. হিন্দি বলয়ের দাপট বনাম বাংলার গুরুত্ব: আসন পুনর্বিন্যাসের মূল ভিত্তি যদি হয় ২০১১ সালের জনগণনা, তাহলে বাংলা বা দক্ষিণ ভারতের রাজ্যগুলির তুলনায় উত্তরপ্রদেশ, বিহার এবং রাজস্থানের মতো রাজ্যগুলিতে আসন সংখ্যা অনেক বেশি হারে বাড়বে। কারণ, ওইসব রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বাংলার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সংসদীয় রাজনীতিতে জাতীয়স্তরে পশ্চিমবঙ্গের এবং দক্ষিণী রাজ্যগুলির আনুপাতিক গুরুত্ব কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকছে।
২. ভৌগোলিক ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ: বিধানসভার আসন ২৯৪ থেকে ৪৪১ হলে অনেক ছোট ছোট নির্বাচনী এলাকা তৈরি হবে। প্রশাসনিকভাবে এটি সুবিধাজনক হলেও, এতে স্থানীয় রাজনীতির সমীকরণ আমূল বদলে যাবে। অনেক হেভিওয়েট নেতার চেনা নির্বাচনী ক্ষেত্র ছোট হয়ে যাবে বা অবলুপ্ত হতে পারে।
তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ইতিমধ্যেই এই ডিলিমিটেশন বিলের তীব্র বিরোধিতা করেছেন। তাঁর মতে, এটি পশ্চিমবঙ্গকে রাজনৈতিকভাবে দুর্বল করার এবং ‘ডিভাইড অ্যান্ড রুল’ নীতি কার্যকর করার একটি কৌশল। বিরোধীদের একাংশের আশঙ্কা, আসন পুনর্বিন্যাসের পর এনআরসি বা ভোটারতালিকা সংশোধনের মাধ্যমে ভোটারদের অধিকার কেড়ে নেওয়া হতে পারে। শাসক শিবিরের দাবি, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের পুরস্কার দেওয়ার বদলে উল্টো বাংলাকে ‘শাস্তি’ দেওয়া হচ্ছে।
যদি ২০২৯-এর মধ্যে এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়, তাহলে ২০৩১ সালের বিধানসভা নির্বাচন হবে ৪৪১টি আসনে। এটি কেবল ভোটারদের সংখ্যাতত্ত্ব নয়, বরং বাংলার প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধিত্ব এবং রাজ্য রাজনীতির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভরকেন্দ্রকেও বদলে দিতে পারে।
দিল্লির এই ‘মাস্টারপ্ল্যান’ শেষ পর্যন্ত বাংলার রাজনৈতিক আধিপত্য রক্ষা করবে নাকি তাকে উত্তর ভারতের দাপটের নীচে চাপা দিয়ে দেবে, তা নিয়েই এখন সরগরম নবান্ন থেকে সংসদ।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৬ এপ্রিল ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন