কলকাতা: আর জি কর হাসপাতাল ও নিরাপত্তা — এই দুই শব্দ যেন বারবার বিপ্রতীপ মেরুতে দাঁড়িয়ে যাচ্ছে! ২০২৪ সালের অগস্টে কর্তব্যরত অবস্থায় চিকিৎসক ‘অভয়া’র ধর্ষণ ও খুনের ঘটনার ক্ষত এখনও টাটকা। তার বছর দেড়ক কাটতে না কাটতেই ফের মর্মান্তিক মৃত্যু দেখল এই হাসপাতাল। শুক্রবার ট্রমা কেয়ার বিল্ডিংয়ের লিফটে আটকে দমদমের বাসিন্দা অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের (৪০) বীভৎস মৃত্যুতে ফের কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন অভয়ার মা। ক্ষোভের সঙ্গে তাঁর প্রশ্ন, “এর পরেও কি এই কর্তৃপক্ষ হাসপাতাল চালানোর যোগ্য?”
দক্ষিণ দমদম পুরসভার কর্মী অরূপ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্মদিন ছিল বৃহস্পতিবার। সেদিনই খাট থেকে পড়ে গিয়ে তাঁর চার বছরের ছেলের হাত ভেঙে যাওয়ায় তাকে নিয়ে আর জি করের ট্রমা কেয়ারে পৌঁছন অরূপ ও তাঁর স্ত্রী। শুক্রবার ভোরে অস্ত্রোপচারের আগে ছেলেকে শৌচালয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য ২ নম্বর লিফটে ওঠেন তাঁরা। কিন্তু, কোনও কমান্ড ছাড়াই লিফটটি নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ওঠানামা করতে থাকে বলে অভিযোগ।
একতলার মেঝে থেকে কিছুটা উঁচুতে লিফট থামলে কোনও ক্রমে স্ত্রী ও সন্তানকে বাইরে বের করে দেন অরূপ। কিন্তু, নিজে বেরোতে গেলেই যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে দরজা বন্ধ হয়ে শরীর অর্ধেক আটকে যায় বলে দাবি সূত্রের। ওই অবস্থাতেই লিফটটি বেসমেন্টের দিকে নামতে শুরু করলে দেওয়াল ও লিফটের ঘর্ষণে পিষ্ট হন অরূপ। ময়নাতদন্তের রিপোর্টে দেখা গিয়েছে, ‘পলি ট্রমা’র কারণে অরূপের পাঁজরের সব হাড় ভেঙে গিয়েছিল এবং ফুসফুস, হৃৎপিণ্ড ও অন্ত্র ফেটে গিয়েছিল।
এই খবর শুনে নিজের সন্তান হারানোর যন্ত্রণা যেন আরও একবার ফিরে পেল পানিহাটির দম্পতি। অভয়ার মা সংবাদমাধ্যমে জানান, “এটাকে দুর্ঘটনা বলব না। লিফটে কোনও লিফটম্যান ছিলেন না। ওঁরা ভিতরে আটকে আর্তনাদ করছিলেন। অথচ, কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসেননি। সবথেকে মর্মান্তিক হল, ওই যুবকের রক্তের ফোঁটা পড়ছিল ওঁর স্ত্রীর গায়ে। ওঁরা বাঁচানোর জন্য চিৎকার করছিলেন। কিন্তু, প্রশাসন ছিল নির্বিকার।”
হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির সদস্য ও বিধায়ক অতীন ঘোষ এবং সুপার সপ্তর্ষি চট্টোপাধ্যায়, উভয়েই পরোক্ষভাবে গাফিলতির কথা মেনে নিয়েছেন। রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও কর্তব্যে চরম অবহেলার অভিযোগে পুলিশ ইতিমধ্যেই পাঁচজনকে গ্রেফতার করেছে। ধৃতদের মধ্যে রয়েছেন তিনজন লিফটম্যান (মিলনকুমার দাস, বিশ্বনাথ দাস, মানসকুমার গুহ) এবং দুই নিরাপত্তাকর্মী (আসরফউল রহমান ও শুভদীপ দাস)। এঁদের বিরুদ্ধে অনিচ্ছাকৃত খুনের মামলা রুজু করা হয়েছে।
দেড় বছর আগের সেই নারকীয় ঘটনার পর হাসপাতালের নিরাপত্তাব্যবস্থা যে বিন্দুমাত্র বদলায়নি, এই ঘটনা যেন তারই এক রক্তাক্ত দলিল হয়ে রইল।

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ মার্চ ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন