অনেকেই ভারতের প্রতি ক্ষুব্ধ কারণ তারা আশা করেছিলেন ভারত শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে দ্রুত ফিরিয়ে আনবে, কিন্তু ভারত সেটি করেনি (!)। ফলে এরা অভিমানে ক্ষোভে এখন বলা শুরু করছে ৫ আগস্ট ঘটানোর পিছনে ভারতেও হাত থাকতে পারে!
মানুষের ইতিহাসের জ্ঞান ও বাস্তববুদ্ধির বড়ই অভাব। নইলে তারা দেখতেন বঙ্গবন্ধু যে ভুল করেছেন শেখ হাসিনা একই ভুল করে একই পরিণতি ভোগ করেছেন। আপনারা কি গতকালে চীনের রাষ্ট্রদুতকে দেখেছেন জামাতের আমিরকে প্রধান অতিথি করে ঢাকায় ঈদ উপহার বিতড়ণ করতে? এই কমিউনিস্ট চীন ভূরাজনৈতিক ধান্দায় উপমহাদেশে পাকিস্তান ও ইসলামিক শক্তিগুলোর গডফাদার। সেই রাজনীতির ছকে ভারতের বন্ধু হিসেবে আওয়ামী লীগের বিপক্ষেও তাদের ঐতিহাসিক অবস্থান। সেই চীনকে শেখ হাসিনা ক্ষমতার শেষ বছরগুলোতে বন্ধু বানিয়ে ভারতকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন।
বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের অকৃত্রিম বন্ধু ইন্দিরা গান্ধি, যিনি রাজনৈতিক কারণেই নয়, নানা ঘটনায় প্রমাণ হয়েছে তিনি বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধুর প্রতি ব্যক্তিগতভাবে দুর্বল ছিলেন। সেই ইন্দিরা গান্ধির বন্ধুত্বকে দূরে সরিয়ে বঙ্গবন্ধু তার শত্রু আরব মুসলিম ভাইদের সঙ্গে বন্ধুত্ব করতে গেলেন, চীন, পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা করতে গেলেন, ভারত দূরে সরে গেলো। ভারতের বাংলাদেশে যে ধরণের ঘাঁটি দরকার ছিল যা স্বাধীনতা বিরোধীদের সংঘঠিত হতে দিতো না সেটি তো বঙ্গবন্ধুই নষ্ট করেছিলেন। কেন ভারতীয় সেনাবাহিনীকে রাখতে বঙ্গবন্ধু ইচ্ছুক ছিলেন না? ভয়টা কিসের? বাংলাদেশ দখল করে নিবে ভারত? এর ফল কি হয়েছিল? সিরাজ সিকদার, জাসদ আর স্বাধীনতা বিরোধীরা, ভাসানী সবাই মিলে বাংলাদেশকে নরক বানিয়ে ছেড়েছিল। এমনকি বঙ্গবন্ধু ভারতকে বিশ্বাস পর্যন্ত তখন করতো না! ‘র’ কর্মকর্তারা যখন আগাম বার্তা দিয়েছিলো মুজিব সরকারের বিরুদ্ধে ক্যু হতে যাচ্ছে এবং তাঁকে হত্যা করতে চাইছে তিনি এসবকে ভারতের বাড়াবাড়ি চিন্তা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।
১৫ আগস্ট ঘটে গিয়েছিল। আমেরিকা যেমন পরাশক্তি হয়েও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঠেকাতে পারেনি তেমনি ১৫ আগস্টের পর মুশতাক সরকারকে ঠেকিয়ে আওয়ামী লীগকে ভারত ফেরাতে পারেনি। পারেনি মানে সেটা তো কোন দেশের কাজ নয়। এক দেশ থেকে আরেক দেশে আসলে প্রভাব বিস্তার করা যায়, কিন্তু সব কিছু করা যায় না। তো, সেই ভারত আওয়ামী লীগের জন্য কি করেছিল? এটা জানা দরকার। তাহলে বর্তমান পরিস্থিতিটা বুঝতে পারবেন।
শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানি থেকে ভারত আসেন ১৯৭৫ সালের ২৫ আগস্ট। শেখ হাসিনার ভারত আগমন ছিল ভারত সরকারের শেখ হাসিনা ও রেহানার জন্য রাজনৈতিক আশ্রয়। বঙ্গবন্ধুর অন্যতম রাজনৈতিক বন্ধু চিত্তরঞ্জন সুতার ও ভারত সরকারের বিশেষ কর্মকর্তারা অত্যন্ত গোপনীয়তায় শেখ হাসিনা ও রেহানাকে দিল্লির ৫৬ পান্ডারা রোডের একটি ফ্ল্যাটে রেখে আসেন। এই ফ্ল্যাটটি ভারত সরকার বঙ্গবন্ধুর দুই কন্যার জন্য বরাদ্দ দেয়। দুজনের জন্যই ভারত সরকার ভাতার ব্যবস্থা করেন এবং শেখ হাসিনার স্বামী ড. ওয়াজেদকে ভারতীয় পরমাণু শক্তি কমিশনে ফেলোশিপ দেয়া হয়। ১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা দেশে ফেরার আগ পর্যন্ত ভারত সরকার এই সুবিধাগুলো দিয়ে যায়। এই যে ৮১ সালে দেশে ফেরা ও তারপর এরশাদ বিরোধী ৯ বছরের আন্দোলন, তারপর ৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পরাজয়, তারপর ৯৬ সালে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন- এই দীর্ঘ ২১ বছরের যে যাত্রা সেখানে ভারত কি চামচে করে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় বসায়নি ইচ্ছে করে? নাকি এরকম করে সরকারে বসানো কোন দেশের পক্ষে সম্ভব নয়?
জামাত-বিএনপি তাদের বন্ধুদের চেনে এবং সব সময় তাদের বন্ধুদের মনে রাখে। কিন্তু আওয়ামী লীগ তো তা মনে রাখে না। আওয়ামী লীগের মার্কা যেমন নৌকা তারা করে কী দুই নৌকায় পা দিয়ে চলে। এদের মনে হয় বাঙালি মুসলমানের আইডেন্টি ক্রাইসিস বলতে যা বুঝায় সেটা সবচেয়ে বেশি কাজ করে। বাংলাদেশের সেক্যুলার ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির নৌকায় পা রেখে একই সঙ্গে এরা মুসলিম জাহানের মুসলিম লীগ নৌকায় পা দিয়ে রাখে। ফলে প্রতিবার শত্রুকে বুকে টেনে এনে ভারত (যারা কৌশলগত কারণে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগকে বেশি নির্ভরযোগ্য মনে করে তাদের নিরাপত্তার জন্য। ফলে কংগ্রেসের রাজনৈতিক শত্রু হলেও বিজেপিও আওয়ামী লীগের উপর বিশ্বাসটা করতে হয়েছে)-কে দূরে সরিয়ে দেয়। এবং বারবার বিধ্বংস্থ হবার পর আশায় বসে থাকে ভারত কিছু একটা ম্যাজিক করে আওয়ামী লীগকে উদ্বার করে দিবে!
১৯৮১ সালে শেখ হাসিনা ভারতে অবস্থান করেই আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন এবং ভারত থেকেই দল পরিচালনা করেন। এই দীর্ঘ ৬টি বছর ইন্দিরা গান্ধি প্রতিনিয়ত শেখ হাসিনার খোঁজ-খবর নিয়েছেন। কোন আরব বিশ্বের মুসলমান ভাইয়ারা নেয়নি। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় থাকতে সৌদি বাদশাহকে মুসলিম বিশ্বের অভিভাবক হিসেবে বাংলাদেশেরও অভিভাবক বলেছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাকে আবার ভারতেই আশ্রয় নিতে হয়েছে। সেখান থেকেই তাকে সেই ৭৫ সালের ২৫ আগস্টের পর যেভাবে দল পরিচালনা করতে হয়েছে সেটাই করতে হচ্ছে, হবে।
তৃণমূলের লড়াইটা রাজনৈতিকভাবেই করতে হবে। ভোট নির্বাচন গণতান্ত্রিক কার্যক্রমে ফিরতে হবে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর কাদের সিদ্দিকী, চট্টগ্রামের এবিএম মহিউদ্দীন চৌধুরী ও নারায়ণগঞ্জের নাসিম ওসমান ভারতের মেঘলায় ত্রিপুরা সীমান্ত সংলগ্ন এলাকায় খন্দকার মুশতাক সরকারের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে যায় ১৯৭৭ সাল পর্যন্ত। ‘জাতীয় মুক্তিবাহিনী’ ছিল কাদের সিদ্দিকীর এই বিশাল বাহিনীর নাম। এই বাহিনীর এক সদস্য অমরেন্দ্রনাথ ঘোষকে এরশাদের সামরিক আদালত ফাঁসির আদেশ দিলে কাদের সিদ্দিকী ইন্দিারা গান্ধিকে ফোন করে হস্তক্ষেপ কামনা করলে এরশাদ সরকারকে ভারত সরকার চাপ দিয়ে অমরেন্দ্র ঘোষকে মুক্তির ব্যবস্থা করে। এটুকুই ভারত বা যে কোন দেশ করতে পারে। বাকী কাজটুকু, রাজনীতিতে ফেরা ও সফল হওয়াটা নিজেদেরই করতে হবে।
স্মরণ রাখতে হবে কাদের সিদ্দিকীদের এইসব ‘যুদ্ধ’ দ্বারা আওয়ামী লীগ রাজনীতে ফিরেনি। ফিরেছিল গণতান্ত্রিক রাজনীতি দিয়েই। কিন্তু এমন বন্ধু (ভারত) থাকার পরও যদি বেঈমানের মত সারাক্ষণ ষড়যন্ত্রের গুজব ছড়ান তাহলে লাভ কিছুই হবে না। ক্ষমতায় থাকলে মুসলিম উম্মার খাউজানি উঠবে আর বিপদে পড়লেই হিন্দু কাফেরদের সহায়তা কামনা করবেন কেন? আগে নিজেদের রাজনৈতিক মিত্রদের আদর্শিকভাবে গ্রহণ করতে রাজনৈতিকভাবে নেতাকর্মীদের শিক্ষিত করুন। বারবার ভুলের কিন্তু কোন মাসুল হয় না।
(সুষুপ্ত পাঠক একজন বাংলাদেশী লেখক)।
বিষয় : India Bangladesh Awami League

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ মার্চ ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন