মাদুরোকে তুলে আনার পর পশ্চিমা মিডিয়ায় ট্রাম্পের বাহবা নিয়ে যে হৈচৈ চলছে, তাতে মনে হতে পারে আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদ আবার তার পুরনো দিনের দাপট ফিরে পেয়েছে। কিন্তু টিম মার্শাল যেমন বলেছেন, এই সামরিক অভিযান আসলে প্যাক্স আমেরিকানার মৃত্যুর রেটল। যে সাম্রাজ্যকে কূটনীতি ছেড়ে বারবার বুটের ভাষায় কথা বলতে হয়, সেই সাম্রাজ্য আর তার আধিপত্য ধরে রাখতে পারে না।
বিষয়টা সহজ। শক্তিশালী সাম্রাজ্যের প্রয়োজন পড়ে না নগ্ন সামরিক শক্তি প্রদর্শনের। তার কম্প্রাডোর বুর্জোয়ারা, তার আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো, তার বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলো নিজেরাই কাজ সেরে ফেলে। আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক, ডব্লিউটিও এগুলো তো শুধু অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নয়, এগুলো সাম্রাজ্যবাদের শোষণযন্ত্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে এই তথাকথিত রুলস বেসড ওয়ার্ল্ড অর্ডার দিয়ে তৃতীয় বিশ্বকে লুটপাট করা হয়েছে পদ্ধতিগতভাবে। ঋণের ফাঁদে ফেলে, স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম চাপিয়ে দিয়ে, প্রাকৃতিক সম্পদের উপর কর্পোরেট দখল নিশ্চিত করে। কিন্তু এখন সেই ব্যবস্থা ফাটল ধরছে। লাতিন আমেরিকায় পিংক টাইড, এশিয়ায় চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, আফ্রিকায় ফ্রান্সবিরোধী জাগরণ, এসব কিছুই বলছে একমেরু বিশ্বব্যবস্থা ভাঙছে। তাই এখন খোলাখুলি সামরিক হস্তক্ষেপ ছাড়া আমেরিকার আর উপায় নেই।
ভেনিজুয়েলার তেল দখলের অর্থনীতিও দেখুন। সাধারণ আমেরিকানদের বোকা বানানো হচ্ছে এই বলে যে এতে তাদের পেট্রল সস্তা হবে, অর্থনীতি চাঙ্গা হবে। বাস্তবে যা হবে তা একদম অন্যরকম। ইরাক যুদ্ধের খরচ দেখেছেন তো? ২০০৩ থেকে ২০১১, প্রায় দুই ট্রিলিয়ন ডলার ব্যয়। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অফ ওয়ার প্রজেক্টের হিসাব অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদে এই খরচ দাঁড়াবে ছয় ট্রিলিয়ন ডলারে। সেই টাকা গেছে কোথায়? হ্যালিবার্টন, ব্ল্যাকওয়াটার, কেবিআর এসব প্রাইভেট মিলিটারি কন্ট্রাক্টরদের পকেটে। এক্সন মোবিল, শেভরন, বিপি এদের তেল দখলে। আর খরচের বোঝা চাপানো হয়েছে আমেরিকান শ্রমজীবী মানুষের ঘাড়ে, ট্যাক্সের মাধ্যমে।
এটাই তো পুঁজিবাদের অমোঘ সূত্র। মুনাফা ব্যক্তিমালিকানায়, ক্ষতি সামাজিকীকরণ করা হয়। ভেনিজুয়েলাতেও একই খেলা হবে। পেন্টাগনের বাজেট থেকে, অর্থাৎ জনগণের ট্যাক্স থেকে খরচ হবে সেনা মোতায়েন করতে, অস্ত্র সরবরাহ করতে, ঘাঁটি বানাতে। আর তেলের মুনাফা তুলবে মুষ্টিমেয় তেল জায়ান্টরা। লকহিড মার্টিন, রেথিয়ন, নর্থরপ গ্রুম্যান এরা অস্ত্র বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার কামাবে। জেনারেল ডায়নামিক্স, এলথ্রি টেকনোলজিস এদের শেয়ারের দাম লাফিয়ে বাড়বে। কিন্তু সাধারণ আমেরিকানরা? তাদের সন্তানরা মরবে যুদ্ধে, তাদের ট্যাক্স খরচ হবে এই মরণযজ্ঞে, তাদের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, অবকাঠামো থেকে বাজেট কেটে নেওয়া হবে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার নিজের শ্রমিক শ্রেণিকেও শোষণ করে, শুধু তৃতীয় বিশ্বকে নয়।
এখন আসি বাংলাদেশের প্রসঙ্গে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যেটা ঘটেছে, সেটাকে যদি কেউ গণঅভ্যুত্থান বলে, তাহলে বুঝতে হবে হয় সে ইতিহাস পড়েনি, নাহয় সে সাম্রাজ্যবাদের দালাল। গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিক শ্রেণির নেতৃত্ব থাকে, কৃষক শ্রেণির অংশগ্রহণ থাকে, শোষিত জনগণের দাবি থাকে। জুলাইয়ের ক্যু'তে ছিল কী? মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট আর এনইডির অর্থায়ন, জামাত শিবিরের ক্যাডার মবিলাইজেশন, সেনা নেতৃত্বের একাংশের সমর্থন, আর বুর্জোয়া মিডিয়ার প্রপাগান্ডা। এটা ছিল ক্লাসিক কালার রেভলিউশন, যেমনটা হয়েছে ইউক্রেনে, জর্জিয়ায়, লিবিয়ায়।
ইউনুস কে? একজন মহাজন, যে গরীবদের সুদের জালে জড়িয়ে ধনী হয়েছে। মাইক্রোক্রেডিটের নামে গ্রামীণ দরিদ্র নারীদের ঋণের বোঝায় চাপিয়ে দিয়েছে। দারিদ্র্য বিমোচনের নামে আসলে করেছে কী? দারিদ্র্যকে পুঁজিকরণ করেছে। নব্য উদারবাদের পোস্টার বয়, বিশ্বব্যাংকের প্রিয় মুখ। নোবেল পুরস্কার? পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ তার দালালদের পুরস্কৃত করে এভাবেই। কিসিঞ্জার পেয়েছিল শান্তিতে নোবেল, যখন সে ভিয়েতনামে গণহত্যার পরিকল্পনা করছিল। ওবামা পেয়েছিল, তারপর ড্রোন দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে হাজারো বেসামরিক মানুষ হত্যা করেছে।
এই ইউনুসের অ-সরকার এখন কী করছে? প্রথমত, শ্রম আইন শিথিল করার পরিকল্পনা। যাতে বিদেশি পুঁজি এসে শ্রমিকদের আরো বেশি শোষণ করতে পারে। রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে ট্রেড ইউনিয়ন নিষিদ্ধ রাখার চেষ্টা। দ্বিতীয়ত, ভারতবিরোধী মেরুকরণ। এটা আসলে চীনবিরোধী কৌশলের অংশ। আমেরিকা চায় দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব কমাতে। বাংলাদেশ ছিল বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এখন সেসব প্রকল্প বন্ধ করে দেওয়ার চাল চলছে। তৃতীয়ত, সংখ্যালঘু নিপীড়ন। হিন্দু সম্প্রদায়ের উপর যে সুপরিকল্পিত হামলা হয়েছে, সেটা দাঙ্গা নয়, পোগ্রম। উদ্দেশ্য একটাই, সামাজিক ফ্যাব্রিক ছিন্ন করে পরিচয়ভিত্তিক রাজনীতি চাপিয়ে দেওয়া, যাতে শ্রেণিসংগ্রাম দুর্বল হয়।
ইউনুস সরকারের অর্থনৈতিক নীতিও পরিষ্কার। আইএমএফের সাথে নতুন ঋণচুক্তি, যেখানে শর্ত থাকবে ভর্তুকি কমানোর, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণের, বিদেশি বিনিয়োগের নামে জাতীয় সম্পদ লুটের সুযোগ দেওয়ার। বিদ্যুৎ, গ্যাস, বন্দর, এসব কিছু তুলে দেওয়া হবে কর্পোরেট লুটেরাদের হাতে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, যেসব প্রকল্প জনগণের অর্থে তৈরি, সেগুলো প্রাইভেটাইজ করার ছক চলছে।
এই ব্যবস্থায় লাভবান কারা? কম্প্রাডোর বুর্জোয়া শ্রেণি, যারা বিদেশি পুঁজির দালালি করে। দুর্নীতিবাজ সামরিক আমলারা, যারা ভূমি দখল আর অস্ত্র কেনাকাটায় কমিশন খায়। এনজিও মাফিয়া, যারা দাতাদের টাকায় বিলাসবহুল জীবনযাপন করে। আর সবচেয়ে বড় লাভবান অবশ্যই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি, যারা আরেকটা দেশকে তাদের নিওকলোনিয়াল শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলল।
কিন্তু ইতিহাস আমাদের শেখায়, সাম্রাজ্যবাদ কখনো স্থায়ী হয় না। ব্রিটিশ সাম্রাজ্য যেমন ভেঙে পড়েছে, সোভিয়েত সামাজিক সাম্রাজ্যবাদ যেমন ধসে গেছে, আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদও শেষ হবে। ভেনিজুয়েলায় যেটা হচ্ছে, সেটা তার মরণ যন্ত্রণা। ইরাক, আফগানিস্তান এসব জায়গায় তারা ট্রিলিয়ন ডলার ঢেলে শেষ পর্যন্ত পালাতে বাধ্য হয়েছে। ভেনিজুয়েলাতেও একই পরিণতি হবে। আর বাংলাদেশে? ইউনুসের এই কারসাজি বেশিদিন টিকবে না। জনগণ একবার বুঝে গেলে, একবার শ্রেণিসচেতনতা জাগলে, কোনো সামরিক বুটও তাদের দাবিয়ে রাখতে পারবে না।
(মতামত লেখকের নিজস্ব।)

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন