আওয়ামী লীগের নামে বাজারে ষড়যন্ত্রীদের একটা অংশ এখন বসে বসে গল্প বানিয়ে ছড়াচ্ছে যে ভারত নাকি বিএনপির সাথে চুক্তি করে তারেক জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী বানাতে রাজি হয়েছে, শুধু শর্ত একটাই, আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দিতে হবে। আর এই কল্পকাহিনীতে বিশ্বাস করা মানুষগুলো হয় রাজনীতির বেসিক কিছুই বোঝে না, নয়তো নিজেদের বোকা বানিয়ে সান্ত্বনা খুঁজছে।
ভারতের যদি সত্যিই এতটা ক্ষমতা থাকতো যে তারা ইউনুসের সরকার আর আমেরিকার গভীর রাষ্ট্রকে উপেক্ষা করে তারেক জিয়াকে ইচ্ছামতো আটকে রাখতে পারে বা দেশে আনতে পারে, তাহলে ৫ই আগস্ট কখনো ঘটতো না। শেখ হাসিনাকে হেলিকপ্টারে করে দিল্লিতে দিয়ে আসতে হতো না সেনাবাহিনীর। এই সহজ যুক্তিটা যারা বুঝতে পারছে না, তারা আসলে বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে।
ভারত কি কখনো বিএনপিকে বিশ্বাস করেছে? উত্তর পরিষ্কার, না। খালেদা জিয়ার আমলে বিএনপি সরকার ভারতবিরোধী জঙ্গিদের আশ্রয় দিয়েছিল, উলফা আর অন্যান্য বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটি বানিয়েছিল বাংলাদেশের মাটি। তারেক জিয়ার দুর্নীতি আর সন্ত্রাসের ইতিহাস ভারত খুব ভালোভাবেই জানে। ৫ই আগস্টের পর বিএনপি নেতারা ভারতকে সামলাতে অনেক চেষ্টা করেছে, কিন্তু ভারত তাদের আর বিশ্বাসযোগ্য মনে করেনি।
তাহলে জয়শঙ্কর কেন এসে তারেক জিয়ার সাথে দেখা করে গেলেন? এখানেই আসল কূটনীতির ব্যাপারটা বোঝা দরকার। খালেদা জিয়ার মৃত্যুকে উপলক্ষ্য করে জয়শঙ্কর তারেককে একটা পরিষ্কার বার্তা দিয়ে গেছেন। সেই বার্তাটা হলো, ইউনুসের ফাঁদে পা দিয়ে তুমি যদি আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে জামায়াতের সাথে মিলে সরকার গঠন করো, তাহলে পরিণতি ভালো হবে না। ভারতের পরামর্শ হলো অন্তর্ভূক্তিমূলক নির্বাচন করো, আওয়ামী লীগসহ সবাইকে সুযোগ দাও। জনগণ যাকে চায় তাকেই ভোট দেবে।
এটা তারেকের প্রধানমন্ত্রীত্বের সার্টিফিকেট না, এটা একটা স্পষ্ট সতর্কবার্তা। হুমকি বললেও ভুল হবে না।
ভারত কেন এই কূটনৈতিক পথে হাঁটলো? কারণ তারা বাংলাদেশের সাথে যুদ্ধ চায় না। এমনকি পাকিস্তানের সাথেও না। যুদ্ধে কেউ জেতে না, এই সত্যটা ভারত বোঝে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে জঙ্গি তৎপরতা, সীমান্তে হামলা, আর ভারতবিরোধী উস্কানির কারণে ভারতের অভ্যন্তরেই তাদের সরকার চাপে পড়েছে বাংলাদেশকে কঠোর শাস্তি দেয়ার জন্য। মুস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে বের করে দেয়াটা সেই চাপেরই একটা হালকা নমুনা মাত্র।
জয়শঙ্করের পরামর্শ বিএনপি কতটা মানবে, সেটা সময়ই বলবে। কিন্তু এক কথা পরিষ্কার, বিএনপি সরকার গঠন করলে আওয়ামী লীগের জন্য কোনো সুসংবাদ নেই। আওয়ামী লীগের অনেকেই এখন বিএনপিকে গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা ভাবতে শুরু করেছেন। তারা নিজেদের অনুপস্থিতিকেই মেনে নিচ্ছেন। এই মানসিকতাটা আত্মঘাতী। বিএনপি কখনো গণতন্ত্রের রক্ষাকর্তা ছিল না, এখনো নেই। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়ি যেভাবে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে, সেটাই প্রমাণ করে বিএনপির আসল চেহারা কী।
বাংলাদেশ থেকে আওয়ামী লীগকে চিরতরে উৎখাত করতে পারলে সবচেয়ে খুশি হবে যে মানুষটি, সে হলো তারেক রহমান। এটা তার জীবনের সবচেয়ে বড় লক্ষ্য। আওয়ামী লীগকে বাঁচিয়ে রাখার মতো কোনো দয়ামায়া তার মধ্যে নেই, থাকার কথাও না।
কেউ কেউ আবার ভাবছেন, নির্বাচনের কারণে জামায়াত আর বিএনপির মধ্যে শত্রুতা তৈরি হয়ে গেছে। এই ধারণাটাও ভুল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী রাজনীতিকে যদি একটা মানবদেহ হিসেবে কল্পনা করেন, তাহলে জামায়াত হলো মস্তিষ্ক, আর বিএনপি হলো শরীরের বাকি অঙ্গ। মস্তিষ্ক ছাড়া শরীর চলে না, শরীর ছাড়া মস্তিষ্ক বাঁচে না। জামায়াত ছাড়া বিএনপি রাজনৈতিকভাবে মৃত, এই সত্যটা তারেক জিয়া খুব ভালো করেই জানেন।
এখন আসি মূল প্রসঙ্গে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে যা ঘটেছে, সেটা কোনো গণঅভ্যুত্থান ছিল না। এটা ছিল একটা সুপরিকল্পিত দাঙ্গা, একটা রাষ্ট্রীয় ক্যু। বিদেশি রাষ্ট্রের অর্থায়নে, ইসলামি জঙ্গি সংগঠনের সক্রিয় সহায়তায়, আর সামরিক বাহিনীর নীরব সমর্থনে দেশব্যাপী এই দাঙ্গা বাঁধানো হয়েছিল। নির্বাচিত একটা সরকারকে ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে ক্ষমতায় বসানো হয়েছে একজন সুদি মহাজনকে, যার নাম মুহাম্মদ ইউনুস।
ইউনুস নিজে কোনো রাজনীতিবিদ নয়, কোনো জনপ্রিয় নেতাও নয়। তার একমাত্র যোগ্যতা হলো পশ্চিমা দুনিয়ার কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা আর বাংলাদেশে তার ব্যবসায়িক স্বার্থ। এই মানুষটাকে প্রধান উপদেষ্টা বানিয়ে যে সরকার গঠন করা হয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ অবৈধ। কোনো নির্বাচন নেই, কোনো জনগণের রায় নেই, আছে শুধু বন্দুকের জোর আর বিদেশি প্রভুদের ইশারা।
জুলাইয়ের দাঙ্গার সময় কী হয়েছিল? সারাদেশে পুলিশ হত্যা করা হয়েছে, সরকারি ভবন জ্বালানো হয়েছে, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর লুটপাট করা হয়েছে। ধানমণ্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর স্মৃতি মুছে ফেলা হয়েছে। জাতীয় জাদুঘর লুট হয়েছে। এগুলো কি কোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের লক্ষণ? না, এগুলো হলো পরিকল্পিত সন্ত্রাস আর রাষ্ট্রীয় অপরাধ।
বিএনপি আর জামায়াত এই পুরো প্রক্রিয়ায় সক্রিয়ভাবে জড়িত ছিল। তারা রাস্তায় নেমে হিংসা ছড়িয়েছে, মানুষ খুন করেছে, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর হামলা চালিয়েছে। এরপর যখন ক্ষমতায় এসেছে, তখন নিজেদের অপরাধ ঢাকতে শুরু করেছে। জুলাইয়ের শহীদদের নামে রাজনীতি করছে, কিন্তু আসল খুনিদের খুঁজে বের করার কোনো আগ্রহ নেই।
ইউনুসের এই তথাকথিত সরকারের পুরো এজেন্ডাই হলো বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে মুছে ফেলা। বঙ্গবন্ধুর ইতিহাসকে বিকৃত করা। আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার ষড়যন্ত্র চলছে। সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের কথা মুছে ফেলার চেষ্টা হচ্ছে। এগুলো কোনো সংস্কার নয়, এগুলো হলো বাংলাদেশের পরিচয় মুছে ফেলার সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা।
বিএনপি এখন ভাবছে তারা নির্বাচনে জিতে যাবে। তারেক জিয়া লন্ডন থেকে দেশ চালাবেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, জনগণ এতটা বোকা নয়। যারা ৫ই আগস্টের পর ক্ষমতায় এসে দেশকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ধ্বংস করেছে, দ্রব্যমূল্য আকাশচুম্বী করে দিয়েছে, তাদের কাছে জনগণ কেন ভোট দেবে?
আওয়ামী লীগের যারা এখন বিএনপির দয়ার উপর ভরসা করছেন, তারা ইতিহাস ভুলে গেছেন। বিএনপি কখনো প্রতিপক্ষকে বাঁচতে দেয়নি। তাদের রাজনীতিই হলো প্রতিপক্ষ নিশ্চিহ্ন করা। ১৯৭৫ সালে জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যা করার পর থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত তাদের একই লক্ষ্য। আওয়ামী লীগকে শেষ করা।
জয়শঙ্করের চিঠি বা ভারতের পরামর্শ, কোনোটাই আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিরাপদ করবে না। যদি আওয়ামী লীগ নিজেদের শক্তি ফিরে না পায়, যদি জনগণের সাথে সংযোগ পুনর্স্থাপন না করে, তাহলে বিএনপির তথাকথিত গণতান্ত্রিক সরকারে তাদের জায়গা হবে না। তারেক জিয়া যখন ক্ষমতায় বসবেন, তখন প্রথম কাজই করবেন আওয়ামী লীগকে আইনিভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা। এটাই তার স্বপ্ন, এটাই তার লক্ষ্য।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে যা চলছে, সেটা হলো একটা অবৈধ সরকারের শাসন। ইউনুস, বিএনপি, জামায়াত, এরা সবাই মিলে দেশকে পেছনের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। মুক্তিযুদ্ধের বাংলাদেশ আর মৌলবাদের বাংলাদেশ, এই দুইয়ের লড়াই চলছে।
(মতামত লেখকের নিজস্ব।)

শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ জানুয়ারি ২০২৬

প্রিয় পাঠক, কারিগরি ত্রুটির জন্য আমাদের ওয়েবসাইটি কয়েকঘণ্টা বন্ধ থাকায় আমরা আন্তরিক দুঃখিত। ভবিষ্যতে এরকম ত্রুটি এড়াতে আমরা বদ্ধপরিকর।
— হিডেন স্টোরিজ পরিবার
আপনার মতামত লিখুন