কলকাতা: ২০২৪-এর লোকসভা নির্বাচনের হলফনামায় তিনি বুক ঠুকে দাবি করেছিলেন, তাঁর বা তাঁর স্ত্রীর নামে কোনো কৃষিজমি বা বাড়ি নেই— অর্থাৎ স্থাবর সম্পত্তি এক্কেবারে ‘শূন্য’! কিন্তু রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর জমানা বদলাতেই তৃণমূলের সেই সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের অগাধ সম্পত্তির এমন এক হাড়হিম করা ‘গোলকধাঁধা’ সামনে এসেছে, যা দেখে চোখ কপালে উঠেছে আমজনতার।
একজন সাধারণ সাংসদ হয়ে কীভাবে এমন রাজকীয় ও জাদুকরী সম্পত্তির মালিক হওয়া যায়, তা নিয়ে ইতিমধ্যেই রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র নৈতিক প্রশ্ন উঠে গিয়েছে। কলকাতা পুরনিগমের খোদ সরকারি নথি বলছে, পুরসভা এলাকায় ‘অভিষেক ব্যানার্জি’-র নামেই নাকি নথিভুক্ত রয়েছে ২৪টি সম্পত্তি! আর এই বিপুল সম্পত্তির রহস্য ফাঁস হতেই এবার ক্যামাক স্ট্রিটের ‘শান্তিনিকেতন’ থেকে শুরু করে কালীঘাটের লিপস অ্যান্ড বাউন্ডসের ডেরা— সর্বত্র সশরীরে পৌঁছাতে শুরু করেছে পুরসভার বিল্ডিং বিভাগের মেগা নোটিস।
মুখ্যমন্ত্রী পদে শপথ নিয়েই শুভেন্দু অধিকারী সাফ জানিয়ে দিয়েছিলেন, বাংলায় কোনো বেআইনি নির্মাণ রেয়াত করা হবে না। সেই কথামতোই এবার খোদ অভিষেকের মালিকানাধীন বা তাঁর সঙ্গে যুক্ত ১৭টি হাইপ্রোফাইল ঠিকানায় বিল্ডিং প্ল্যান লঙ্ঘনের অভিযোগে নোটিস ধরিয়েছে পুরনিগম। কলকাতা পুর আইনের ১৯৮০-এর ধারা ৪০০(১) অনুযায়ী, অনুমোদিত নকশার বাইরে গিয়ে নির্মিত এই সমস্ত অননুমোদিত অংশ ভেঙে ফেলার জন্য মাত্র ৭ দিনের চরম সময়সীমা বা ডেডলাইন বেঁধে দেওয়া হয়েছে।
জানা যাচ্ছে, এই ১৭টি সম্পত্তির মধ্যে ১৪টিই আলিপুর, চেতলা ও কালীঘাট এলাকা সংলগ্ন বরো ৯-এর অন্তর্গত। বাকিগুলির ঠিকানা রয়েছে যাদবপুর, যোধপুর পার্ক ও ভবানীপুরে। চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, হরিশ মুখার্জি রোডের যে ‘শান্তিনিকেতন’ প্রাসাদে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে অভিষেক থাকেন, সেই ভবনে লিফট ও বিলাসবহুল এসকেলেটর বসাতে গিয়ে পুরসভার মূল নকশা ও পরিকাঠামোকে বুড়ো আঙুল দেখানো হয়েছে বলে অভিযোগ। ৭ দিনের মধ্যে নিজেরা এই বেআইনি অংশ না ভাঙলে, সেখানে সরাসরি পুরসভার বুলডোজার চলবে বলে স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।
এই মেগা নোটিস বিতর্কের মাঝেই আবার নাটকীয় মোড় নিয়ে ইস্তফা দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বরো ৯-এর তৃণমূল চেয়ারপার্সন দেবলীনা বিশ্বাস। এদিকে তাঁরই দলের সাংসদের এই বিপুল সম্পত্তির হদিস মেলা প্রসঙ্গে কলকাতার কোণঠাসা মেয়র ফিরহাদ হাকিম ফের সেই চেনা সুরেই দায় ঝেড়ে বলেছেন, তিনি নাকি কিছুই জানেন না! যার জবাবে বিজেপি বিধায়ক তাপস রায় কটাক্ষ করে বলেছেন, “আসলে ফিরহাদকে এখন আর কেউ মানছে না, তাই উনি কিছু জানতেও পারছেন না। তবে নোটিস পাঠিয়ে একেবারে ঠিক কাজ করা হয়েছে।”
অন্যদিকে, হলফনামায় দেখানো ১ কোটি ২৬ লক্ষ টাকার অস্থাবর সম্পত্তির বাইরে এই বিপুল সাম্রাজ্য নিয়ে যখন বিতর্ক তুঙ্গে, তখন দলেরই কুণাল ঘোষ দায় এড়িয়ে বলছেন, “কার কাছে নোটিস গিয়েছে তিনিই বলতে পারবেন।” তবে নিজের বাড়ির সামনে থেকে নিরাপত্তার বজ্রআঁটুনি সরতেই খোদ অভিষেক সুর চড়িয়ে বিধায়কদের বৈঠকে বলেছেন, “আমার বাড়ি ভেঙে দিক, কিন্তু মাথা নত করব না।” মাথা তিনি নত করবেন কি না তা সময়ের অপেক্ষা, তবে একজন সাধারণ জনপ্রতিনিধির এই রাজপ্রাসাদ আর ২৪টি সম্পত্তির আসল উৎস কী, তা জানতে এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে গোটা বাংলা।

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ মে ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন