কলকাতা: বৃষ্টির জল মেখে দিনভর হাড়ভাঙা খাটুনির পর তৈরি হয়েছিল শহিদ স্মরণের মঞ্চ। কিন্তু রাতের অন্ধকার নামতেই বদলে গেল সব চিত্রনাট্য। একুশে জুলাইয়ের মাহেন্দ্রক্ষণের ঠিক আগের রাতে কলকাতার বুকে তৈরি হলো বেনজির টানটান উত্তেজনা। বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে ‘কালীঘাট’ তৃণমূলের সদ্য প্রস্তুত একুশের মঞ্চে আচমকা দুষ্কৃতী তাণ্ডবের অভিযোগে কেঁপে উঠল শহর। হামলা চালিয়ে সভাস্থল তছনছ করে দেওয়ার খবর পাওয়া মাত্রই গভীর রাতে রাজপথে নেমে এলেন তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, সঙ্গে ডেরেক ও ব্রায়েন, মহুয়া মৈত্র, দোলা সেনের মতো শীর্ষ নেতারা। সভার সুরক্ষার খাতিরে আর পিছু না হটে রাতভর ওই ভাঙাচোরা মঞ্চের সামনে বসেই পাহারায় রাত কাটালেন দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব। মঙ্গলবার ভোরের আলো ফুটতেই অবশ্য বদলাতে শুরু করে পরিস্থিতি। পুলিশের কড়া পাহারা আর অল্পসংখ্যক কর্মীদের উপস্থিতিতে তড়িঘড়ি আবার পূর্বের রূপ ফিরে পায় সভাস্থল।
হাইকোর্টের বিশেষ অনুমতি নিয়ে ক্যাথিড্রাল রোডে বিড়লা তারামণ্ডলের সামনে এবার একুশে জুলাইয়ের শহিদ স্মরণের মঞ্চ বেঁধেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। সোমবার সন্ধ্যায় নিজে উপস্থিত হয়ে সভাস্থলের শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি খতিয়ে দেখেন তৃণমূলনেত্রী। তখনই তিনি ক্ষোভ উগরে দিয়ে অভিযোগ করেছিলেন, তাঁদের সভা-মিছিল বানচাল করতে একাধিক বাধা তৈরি করা হচ্ছে এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা সমর্থকদের থাকার জায়গায় সমস্যা সৃষ্টি করা হচ্ছে। তাঁর সেই আশঙ্কাই সত্যি রূপ নেয় রাত ১১টা নাগাদ, যখন আচমকাই খবর আসে মঞ্চে হামলা চালিয়েছে একদল দুষ্কৃতী। মুহূর্তের মধ্যে ফেসবুক লাইভে ভেসে ওঠে তছনছ হয়ে যাওয়া প্যান্ডেল, রাস্তায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ব্যানার ও হোর্ডিংয়ের ছবি। খবর পেয়েই কালবিলম্ব না করে গভীর রাতে সভাস্থলে ছোটেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর সহকর্মীরা। সেখানে পৌঁছেই হ্যান্ড মাইকে দুষ্কৃতীদের তাণ্ডবের তীব্র প্রতিবাদ জানান তিনি এবং স্পষ্ট ঘোষণা করেন, শহিদ তর্পণ সফল করতে তাঁরা রাতভর এই মঞ্চের সামনেই পাহারায় থাকবেন। প্রায় রাত দেড়টা নাগাদ সাংসদ মহুয়া মৈত্র রাজপথ থেকে লাইভে এসে বার্তা দেন, কোনো অদৃশ্য শক্তি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একুশের মঞ্চ ভেস্তে দেওয়ার ষড়যন্ত্র করলেও তা সফল হবে না; সব বাধা কাটিয়ে শহিদ দিবস পালিত হবেই।
অন্যদিকে শহিদ স্মরণের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে রাজ্যের অন্যান্য প্রান্তেও। একই দিনে শহিদ মিনারে আয়োজিত কংগ্রেসের একুশে জুলাই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেও ওঠে একাধিক হিংসার অভিযোগ। কংগ্রেস কর্মীদের কলকাতায় আসার পথে বিভিন্ন জায়গায় বাধা দেওয়া ও মারধর করার অভিযোগ তুলে একটি কড়া প্রেস বিবৃতি জারি করেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। তিনি দাবি করেন, বাঁকুড়ার বড়জোড়া থেকে শহিদ মিনারের উদ্দেশ্যে আসা কর্মীদের বাসে দুর্গাপুরের মুচিপাড়ায় হামলা চালিয়ে ভাঙচুর চালিয়েছে বিজেপির দুষ্কৃতীরা। একই ধরনের হামলার ঘটনা ঘটেছে পূর্ব মেদিনীপুরের পটাশপুরেও। শুধু তা-ই নয়, আসানসোল, কুলটি, উত্তর ২৪ পরগনার বিরাটি, নিউ বারাকপুর ও খড়দহে কংগ্রেসকে বাস না দেওয়ার জন্য মালিকদের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। অন্ডাল স্টেশনে কর্মীদের ব্যাজ পর্যন্ত কেড়ে নেওয়া এবং বাস থেকে নামিয়ে দেওয়ার অভিযোগ থাকলেও, সমস্ত বাধা পেছনে ফেলে সাধারণ মানুষ ও দলীয় কর্মীরা সকালে শহিদ মিনারের পথে নেমেছেন বলে জানান কংগ্রেস নেতৃত্ব। সব মিলিয়ে একুশের ভোরে রাজনৈতিক সংঘাত আর টানাপোড়েনে উত্তপ্ত গোটা বাংলা।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ

মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২১ জুলাই ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন