কলকাতা: চব্বিশ নয়, ছাব্বিশের বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর পর তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে সংগঠনের ভিত। হাত ছেড়েছেন অনুগামীরা, ‘বিদ্রোহী’ হয়ে ক্ষোভ উগরে অন্য দলে নাম লিখিয়েছেন অনেকে।
মূল ‘তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটাই আজ অবলুপ্ত। ঘাসফুল বদলে দল এখন দু’টুকরো। কালীঘাটের নিয়ন্ত্রণে ‘ফুটবলার’ প্রতীক নিয়ে মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস, আর অন্য দিকে ‘খাম’ প্রতীক আঁকড়ে ‘গদ্দার’ তকমাপ্রাপ্তদের গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস।
শূন্য হাতে দাঁড়িয়ে নেত্রী এত দিন গর্জাতেন, “যাঁরা যাওয়ার গিয়েছেন, কর্মীদের নিয়েই দল গড়ব।” কিন্তু পুরভোটের বাদ্যি বাজতেই কি কঠিন বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়? সম্বলহীন হয়ে পড়ার আশঙ্কাতেই কি অবশেষে বদলাতে হল কড়া অবস্থান?
তারই উদাহরণ হয়ে রইল উত্তর দিনাজপুরের ইসলামপুর। সম্প্রতি, স্থানীয় কমলাগাঁও-সুজালি গ্রাম পঞ্চায়েতের সাংগঠনিক সভা থেকে উঠে এল সেই আশঙ্কাজনক বদলেরই ছবি। কালীঘাটের তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফোনের স্পিকার মারফত দেওয়া ভার্চুয়াল ভাষণে তৃণমূলনেত্রীর গলায় ঝরে পড়ল আর্জি, “যাঁরা ফিরতে চান, ১৫ দিনের মধ্যে ফিরে আসুন।”
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই এক বার্তাতেই স্পষ্ট হয়ে গিয়েছে দলের ভেতরের চরম রাজনৈতিক দৈন্য। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে নিশানা করা কিংবা ১৯৯৮ সালের মতো নতুন করে দল গড়ার আত্মবিশ্বাস দেখানোর চেষ্টা করলেও, আসল সত্য ঢাকা দেওয়া যাচ্ছে না।
বিধানসভা ভোটে পরাজয়ের পর থেকেই দলত্যাগীদের ‘গদ্দার’ আখ্যা দিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়েছিলেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়-সহ কালীঘাটের যুব ও শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশ। কিন্তু সামনের পুরভোটে লড়তে গেলে প্রার্থী করার মতো ওজনদার মুখ কোথায়? নিচুতলার সংগঠন সামলানোর অভিজ্ঞ লোক কই?
কালীঘাটের অন্দরেই এখন প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে, তবে কি শুধুই আবেগের বশে অভিজ্ঞ নেতাদের 'গদ্দার' বলে বের করে দেওয়াটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল? এক দিকে যখন দলের নেতারা এখনও বহিষ্কৃতদের বিরুদ্ধে তোপ দাগছেন, ঠিক তখনই মমতার এই উদাত্ত আহ্বান প্রমাণ করছে, সম্বলহীন তৃণমূলনেত্রী এখন যে কোনও মূল্যে পুরনো নেতাদের ফেরাতে মরিয়া।
১৫ দিনের সময়সীমা বেঁধে দিয়ে মমতা হয়তো বোঝাতে চেয়েছেন শেষ সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু রাজনৈতিক মহল একে দেখছে নেত্রীর ব্যাকফুটে চলে যাওয়ারই স্পষ্ট ইঙ্গিত হিসেবে। ‘গদ্দার’ তকমা দিয়ে যাদের দূরে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, পুরসভার ভোটের ঠিক মুখে দাঁড়িয়ে তাঁদের কাছেই আবার দরজা খুলে দেওয়াকে তৃণমূলের রাজনৈতিক নিঃস্বতারই প্রমাণ হিসেবে দেখছে ওয়াকিবহাল মহল।

সোমবার, ০৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন