কলকাতা ও বহরমপুর: কয়েক ঘণ্টার ব্যবধান, আর তাতেই রাজনীতির স্ক্রিপ্টে একেবারে ১৮০ ডিগ্রি ইউটার্ন!
নাটকের পর নাটক, আর শেষ মুহূর্তে নাটকীয় মোড়। মুর্শিদাবাদের রেজিনগর বিধানসভা উপনির্বাচনে নিজের সিদ্ধান্ত থেকে পিছিয়ে এলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিশ্বস্ত সেনাপতি রবিউল আলম চৌধুরী। সকালে যে প্রার্থী সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে প্রার্থীপদ প্রত্যাহারের আগাম বার্তা দিয়ে প্রশাসনিক ভবনের দিকে রওনা দিয়েছিলেন, দুপুর গড়াতেই সেই রবিউলই ঘোষণা করলেন, তিনি নির্বাচনী ময়দান ছেড়ে এক পা-ও পিছু হটছেন না। নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরাসরি এক ফোনেই সমস্ত জল্পনা ও দোলাচলের অবসান ঘটল।
পুরো ঘটনাক্রমের গতিপ্রকৃতি এত দ্রুত পরিবর্তিত হয়েছে যে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাও তা দেখে তাজ্জব! আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনের জন্য যখন জোরকদমে প্রস্তুতি চলার কথা, তখনই নির্বাচন কমিশন মূল তৃণমূলের নাম ও 'জোড়াফুল' প্রতীক ফ্রিজ করে দেয়। মমতাপন্থীদের নতুন রাজনৈতিক পরিচয় হয় 'মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' এবং নতুন প্রতীক জোটে 'ফুটবলার'। এই নতুন প্রতীক সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছানো এবং কর্মীদের ওপর ব্যাপক প্রশাসনিক বা রাজনৈতিক চাপের অজুহাত তুলে শুক্রবার নন্দীগ্রামের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে আচমকাই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
নন্দীগ্রামের দেখাদেখি শনিবার সকালেই রেজিনগরের আকাশে-বাতাসেও একই গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। শনিবারই ছিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। সকালে সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে রবিউল আলম চৌধুরী স্পষ্ট বলেছিলেন, “কর্মীদের ওপর ভয়ঙ্কর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তাঁদের ময়দানে নামানো যাচ্ছে না। নতুন ‘ফুটবলার’ প্রতীক এত কম সময়ে ভোটারদের চেনানো অসম্ভব। কর্মীদের না পেলে আমি একা ভোট করব কীভাবে? তাই মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি।” এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি বহরমপুরের দিকে রওনা দেন।
রবিউলের এই আকস্মিক সিদ্ধান্তের খবর মুহূর্তের মধ্যে পৌঁছায় কালীঘাটে। সূত্রের খবর, খবর পাওয়া মাত্রই আর সময় নষ্ট না করে সরাসরি রবিউলকে ফোন করেন দলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। ফোনে দীর্ঘক্ষণ দু'জনের কথা হয়। সূত্রের খবর, দলনেত্রী তাঁকে স্পষ্ট জানান, এই কঠিন পরিস্থিতিতে ময়দান ছেড়ে সরে যাওয়া দলের ভাবমূর্তির পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক হবে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, নেত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে তাঁকে লড়ে যেতে হবে। মমতার সেই অভয়বাণী এবং আস্থার পর রবিউলের মনোভাব পুরোপুরি বদলে যায়।
কিছুক্ষণ পরেই সম্পূর্ণ বিপরীত মেজাজে দেখা যায় রবিউলকে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, “যা হবে দেখা যাবে! প্রার্থিপদ প্রত্যাহারের যে সিদ্ধান্ত আমি সকালে নিয়েছিলাম, দিদির সঙ্গে কথা বলার পর তা থেকে পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছি। দিদি আমাকে আশ্বাস দিয়েছেন। আমরা তো ওঁর রাজনীতি করি, উনি যেভাবে নির্দেশ দেবেন, আমি ঠিক সেভাবেই চলব। নির্বাচনে লড়াই হবেই।” কর্মীদের অনুপস্থিতি ও নতুন প্রতীকের সমস্যা নিয়ে প্রশ্ন করা হলে একগাল হেসে রবিউল জবাব দেন, “আমাদের সঙ্গে এক জন কর্মী থাকলেও তাঁকে নিয়েই আমরা মমতার প্রতিনিধি হিসেবে লড়ব। আমরা আগেও বহু নির্বাচন সামলেছি, কর্মীরা এবারও ঠিক সামলে নেবে।”
রবিউলের এই ইউটার্নের ফলে এক ঐতিহাসিক ও অভূতপূর্ব রাজনৈতিক বিপর্যয় এড়ানো গেল বলা চলে। কারণ নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগর, দুই কেন্দ্র থেকেই মমতার প্রার্থীরা সরে দাঁড়ালে বঙ্গ রাজনীতির দীর্ঘ ২৯ বছরের ইতিহাসে প্রথমবার মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ও প্রতিনিধিত্ব ছাড়া কোনও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতো। নন্দীগ্রামে অবশ্য তৃণমূল সমর্থিত সঞ্চিতা সরে দাঁড়ানোর পর মমতা কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করেছেন। কিন্তু রেজিনগরে রবিউল লড়াইয়ে টিকে থাকায় 'মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস' তাদের ফুটবলার প্রতীক নিয়ে সরাসরি ভোটযুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। শনিবার বিকেল থেকেই নতুন উদ্যমে প্রচার শুরু করে দিয়েছেন রবিউল ও তাঁর অনুগামীরা। তবে নেত্রী নিজে তাঁর প্রচারে মুর্শিদাবাদ যাবেন কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে, ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচন ও ৯ অক্টোবরের ফলপ্রকাশের আগে রেজিনগরের এই ছত্রে ছত্রে নাটক বঙ্গ রাজনীতিকে এক অন্য উত্তেজনার চূড়ায় পৌঁছে দিল।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন