মুম্বই ও নতুন দিল্লি: দেড় শতাব্দীর প্রাচীন উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, যেখানকার মেধা ও সামাজিক মর্যাদা নিয়ে দেশজুড়ে চর্চা হয়, সেই স্বনামধন্য ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) বম্বে এখন উত্তাল। পরীক্ষার হলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সংস্থা 'চ্যাটজিপিটি' (ChatGPT) ব্যবহার করে টুকলির অভিযোগ এবং তার পরবর্তী প্রশাসনিক জিজ্ঞাসাবাদের টানাপোড়েনে দ্বিতীয় বর্ষের এক ছাত্রের আত্মহত্যার ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়েছে।
শুক্রবার সন্ধ্যায় পবই ক্যাম্পাসের হোস্টেল কক্ষ থেকে উদ্ধার হয়েছে সাহিল ওয়াকোড়ে নামে ২২ বছর বয়সি ওই পড়ুয়ার নিথর দেহ। গত সাত মাসের মধ্যে আইআইটি বম্বে ক্যাম্পাসে এটি তৃতীয় আত্মহত্যার ঘটনা। এই মর্মান্তিক মৃত্যুর খবর সামনে আসতেই প্রশাসনিক চরম গাফিলতি ও শাস্তির হুমকির প্রতিবাদে রাতভর তুমুল বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন চার শতাধিক ক্ষুব্ধ ছাত্রছাত্রী।
পুলিশ ও আইআইটি কর্তৃপক্ষ সূত্রের খবর, মৃত ছাত্র সাহিল এনার্জি সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের বিটেক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র ছিলেন। শুক্রবার পরীক্ষা চলাকালীন হল পরিদর্শক তাঁকে মোবাইল ফোন ব্যবহার করতে গিয়ে ধরে ফেলেন।
অভিযোগ, তিনি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রটি সরাসরি চ্যাটজিপিটি-তে আপলোড করে উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছিলেন। এই ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরেই তাঁকে সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও বিভাগীয় প্রধানের (HoD) ঘরে ডেকে পাঠানো হয়।
মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কর্তৃপক্ষের তরফে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ওই ছাত্রের বিরুদ্ধে কোনও শাস্তিমূলক পদক্ষেপ বা ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন নেওয়া হয়নি। বরং তাঁকে বিভাগীয় প্রধান এবং শিক্ষক কাউন্সিলিং করেন এবং আশ্বাস দেন যে এই ঘটনার কারণে তাঁর শিক্ষাজীবনে বা ভবিষ্যতের ক্যারিয়ারে কোনও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না। আলোচনার পর সাহিল তাঁর হোস্টেল নম্বর ৪-এর ঘরে ফিরে যান। কিন্তু শুক্রবার গভীর সন্ধ্যায় সাড়াশব্দ না পেয়ে ঘরের দরজা ভেঙে সিলিং ফ্যান থেকে তাঁর ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার করা হয়।
আইআইটি বম্বে এই মর্মান্তিক ঘটনায় গভীর শোক প্রকাশ করে জানিয়েছে, তারা মৃতের সহপাঠী, শিক্ষক ও পরিবারকে সমস্ত রকম সহায়তা দিচ্ছে এবং ঘটনার পরিস্থিতি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই দাবি মানতে নারাজ আন্দোলনরত ছাত্রছাত্রী ও সাহিলের পরিবার।
মৃত ছাত্রের মায়ের অভিযোগ, তাঁর ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে মানসিক হেনস্থা করা হয়েছে। তিনি বিচার চেয়ে ইতিমধ্যেই পুলিশে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। অন্য দিকে, ক্যাম্পাসে বিক্ষোভকারী ৪০০-র বেশি পড়ুয়ার অভিযোগ, কর্তৃপক্ষ সম্পূর্ণ সত্য গোপন করছে।
আন্দোলনকারী ছাত্রদের দাবি, নকল করার অপরাধে সাহিলকে এক বছরের জন্য সাসপেন্ড করার মারাত্মক হুমকি দেওয়া হয়েছিল। সাসপেনশন হলে তাঁকে তৎক্ষণাৎ হোস্টেল খালি করে বাইরে থাকতে হতো এবং চার বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রি সম্পন্ন হতে অন্তত পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় লেগে যেত। এই চরম কেরিয়ার সংকট, সামাজিক লজ্জা ও মানসিক চাপের কারণেই সাহিল এই চরম সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন বলে আন্দোলনকারীদের দাবি।
বিদ্যুৎ বিভাগের এক বিক্ষোভকারী তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “ক্যাম্পাসে এটা প্রথম ঘটনা নয়। গত সাত মাসে তিন জন এবং চলতি বছরেই চার জন ছাত্র আত্মহত্যা করল! গত দু’মাসে দু’টি ঘটনা ঘটেছে। এত মৃত্যু কেন হচ্ছে, ভেতরের আসল কারণটা কী, প্রশাসন তা নিয়ে পুরোপুরি অন্ধকার বজায় রাখছে। আমরা ডিন, ডিরেক্টর ও পুরো প্রশাসনের কাছ থেকে স্পষ্ট লিখিত রিপোর্ট ও জবাবদিহি চাই।”
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পাওয়াই ক্যাম্পাসে বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। সিনিয়র পুলিশ অফিসার দত্তাত্রেয় নলওয়াড়ে জানান, অপমৃত্যুর মামলা দায়ের করে ময়নাতদন্ত শুরু হয়েছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেও এক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রের দেহ উদ্ধার হয়েছিল হোস্টেল থেকে। এরপর গত জুলাই মাসে নতুন সেমিস্টার শুরুর মুখে ২০ বছরের এক বিটেক ছাত্র আত্মহত্যা করেন। ব্যাক-টু-ব্যাক তিনটি ছাত্রমৃত্যুর পর আইআইটি বম্বের মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহি এখন বড়সড় প্রশ্নের মুখে।

শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন