মুম্বই: “আমাদের সবাইকে একদিন চলে যেতে হবে। কাল আমি এখানে থাকব কি না, তাও জানি না…”— প্রখ্যাত অভিনেতা ও পরিচালক নানা পাটেকরের এই বাক্যটিই যেন তাঁর প্রয়াণের পর সবচেয়ে বড় অধ্যায় হয়ে উঠল।
মৃত্যুর মাত্র চার দিন আগে, গত ৪ অক্টোবর, গোয়ার ডোনা পাউলায় এক অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে জীবন ও মৃত্যুর এই পরম সত্য উচ্চারণ করেছিলেন তিনি। বৃহস্পতিবার ভোরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় চিরবিদায় নিলেন জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এই বর্ষীয়ান শিল্পী। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। প্রিয় অভিনেতার এই অকস্মাৎ প্রয়াণে কেবল তাঁর কোটি কোটি অনুরাগীই নন, গভীর শোকস্তব্ধ গোটা বলিউড ও রাজনৈতিক মহল।
হাসপাতাল সূত্রে খবর, গোয়ার বাড়িতে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ার পর প্রবীণ অভিনেতাকে তড়িঘড়ি গোয়ার মণিপাল হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালের অনকোলজি বিভাগের প্রধান ডাঃ শেখর সালকার জানান, চিকিৎসকেরা প্রায় ৪৫ মিনিট ধরে অনবরত সিপিআর (CPR) দিয়ে তাঁকে সুস্থ করে তোলার আপ্রাণ চেষ্টা চালান। কিন্তু সমস্ত প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা ২০ মিনিটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন নানা। গোয়া পুলিশ জানিয়েছে, একটি মেডিকো-লিগ্যাল কেস (MLC) রুজু করে ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে।
মৃত্যুর আগে গোয়ার ডোনা পাউলার ‘তাজ সিদাদে’ হোটেলে ‘সম্রাট ক্লাব ইন্টারন্যাশনাল’-এর বর্ষপূর্তি ও দায়িত্ব হস্তান্তর অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন পদ্মশ্রী সম্মানপ্রাপ্ত এই অভিনেতা। সাদা কুর্তা আর গলায় সাদা গামছা জড়িয়ে চিরাচরিত সাদামাটা রূপেই মঞ্চে উঠেছিলেন নানা।
গোয়ার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মনোহর পর্রিকরের কর্মপদ্ধতির ভূয়সী প্রশংসা করে মারাঠি ভাষায় আবেগঘন বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে তিনি বলেন, “জীবন একদিন শেষ বিন্দুতে পৌঁছবেই। কিন্তু সেই মুহূর্তটি আসার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত, আমি যা করতে চেয়েছিলাম, তা কি করে যেতে পারছি?” মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এমন গভীর আত্মোপলব্ধির কথা শুনে সেদিন যাঁরা করতালি দিয়েছিলেন, তাঁরা স্বপ্নেও ভাবেননি যে এই বক্তব্যই নানা পাটেকরের জীবনের শেষ সর্বজনীন ভাষণ হয়ে থাকবে।
নানা পাটেকরের এই অকস্মাৎ বিদায়ে বলিউডে শোকের আবহ। প্রকাশ রাজ গভীর শোক প্রকাশ করে লিখেছেন, “তোমাকে খুব মনে পড়বে নানাজি। তোমার সঙ্গে কাটান মুহূর্ত, অন্তহীন তর্ক, তোমার হাতে রান্না করা খাবার আর অর্জিত জ্ঞানের ভাগ নেওয়া, সব স্মৃতি হয়ে রইল। আমার জীবনযাত্রায় আসার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।”
অভিনেতা ও সাংসদ রবি কিশন বলেন, “নানাজির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত ও আত্মিক সম্পর্ক ছিল। তাঁর সরলতা, অভিনয় আর জীবনকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি থেকে অনেক কিছু শিখেছি। তাঁর চলে যাওয়া আমার ব্যক্তিগত ক্ষতি।”
প্রবীণ অভিনেতা রীতেশ দেশমুখ নানা পাটেকরকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বলেন, “পর্দার ভেতরে এবং বাইরে— সব অর্থেই তিনি ছিলেন আসল নায়ক। তাঁর অভিনয়ের ধারা ছিল একদম অনন্য। নায়ক, ভয়ানক খলনায়ক কিংবা সিরিয়াস কমেডি যে চরিত্রই তিনি ছুঁয়েছেন, তাকেই জীবন্ত করে তুলেছেন। তাঁর মতো অভিনয়শৈলী আর দ্বিতীয় কারও নেই।”
‘গমন’, ‘পরিিন্দা’, ‘ক্রান্তিবীর’, ‘তিরঙ্গা’ থেকে শুরু করে ‘আব তক ছাপ্পান’, ‘রাজনীতি’ কিংবা অতি সম্প্রতি শাহিদ কাপুরের সঙ্গে ‘ও' রোমিও’, ভারতীয় চলচ্চিত্র শিল্পে নানা পাটেকরের অবদান চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে।
তবে কেবল পর্দার অভিনয়েই সীমাবদ্ধ থাকেননি তিনি, মহারাষ্ট্রের খরা পীড়িত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে তাঁর ‘নাম ফাউন্ডেশন’-এর সামাজিক কাজ তাঁকে সাধারণ মানুষের হৃদয়ে চিরস্থায়ী আসন দিয়েছে। চার দিন আগের সেই ভাষণ আর হৃদরোগের আকস্মিক আঘাত, সব মিলিয়ে এক মহীরুহের পতনে স্তব্ধ ভারতীয় চলচ্চিত্র জগৎ।

বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন