সংবাদদাতা, কলকাতা: মর্মান্তিক। কলকাতার দুর্গাপুজোয় মৃত্যুমিছিল। চোরবাগান সর্বজনীন দুর্গাপুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হয়ে কমপক্ষে ১৮ জনের মৃত্যু। বেশ কয়েকজন আহত হয়েছেন। আহতদের কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ ও অন্য সরকারি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। চোরবাগান সর্বজনীনে প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে প্রশাসন। পরিস্থিতি সামাল দিতে ঘটনাস্থলে আসেন কলকাতা পুলিশের উচ্চপদস্থ আধিকারিকরা। তবে কীভাবে এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটল, তা নিয়ে এখনও বিস্তারিত তথ্য সামনে আসেনি। পুজোমণ্ডপে বিপুল ভিড়ের জেরেই পদপিষ্ট হওয়ার মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।সাময়িক বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে একাধিক পুজো মন্ডপ। এবার বিজেপি সরকারকে আক্রমণ মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের।
ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সোশ্যাল মিডিয়ার একটি পোস্টে মমতা লেখেন, "চোরবাগানের পুজোয় পদপিষ্টের ঘটনায় বিস্মিত ও মর্মাহত। মা দুর্গার কাছে প্রার্থনা করি, আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক। আর মৃতদের পরিবার এই কঠিন সময় যাতে কাটিয়ে উঠতে পারে।" মমতা শোকপ্রকাশ করলেও বিজেপি সরকারকে একহাত নিয়েছেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তিনি জানিয়েছেন, "চোরবাগান পুজো মণ্ডপে পদপিষ্টের ঘটনায় গভীরভাবে মর্মাহত ও উদ্বিগ্ন। পুজোয় বেরিয়ে সাধারণ মানুষকে কেন নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে আতঙ্কে থাকতে হবে? জমিদারদের নিরাপত্তায় পুলিশ মোতায়েনের পাশাপাশি বাংলার সাধারণ মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করাও রাজ্য সরকারের দায়িত্ব। মানুষের জীবনের চেয়ে বড় কোনও অগ্রাধিকার হতে পারে না। এই ঘটনার যথাযথ তদন্ত ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।আহত প্রত্যেকের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। এই কঠিন সময়ে তাঁদের ও তাঁদের পরিবারের সকলের প্রতি রইল আমার আন্তরিক সমবেদনা ও প্রার্থনা। মা দুর্গা তাঁদের এই দুঃসময় কাটিয়ে ওঠার শক্তি ও সাহস দিন।" শুধু তাই নয়, অভিষেকের অভিযোগ, এই পুজোর সঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপো জড়িত আছেন। এবার রাজধর্ম পালন করুন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখেন, "চোরবাগান সর্বজনীন পুজো কমিটিতে শুভেন্দু অধিকারীর ভাইপোর যুক্ত থাকার অভিযোগ উঠেছে। এই মর্মান্তিক ঘটনায় এখনও পর্যন্ত ১৮ জনের মৃত্যুর খবরও সামনে এসেছে। অপরাধী ভাইপোকে জেলে কবে ঢোকাচ্ছেন শুভেন্দু বাবু ? ১৮ জনের মৃত্যুর দাগ কিন্তু ডাবল ইঞ্জিন ওয়াশিং মেশিনেও উঠবে না আর ভাইপোর সাথে বিজয় ওঝা আর তমোঘ্ন ঘোষকেও ভুলবেন না। রাজধর্ম পালন করুন ।"
মমতা তৃণমূল কংগ্রেসের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ দাবি করেছেন, "চোরবাগান। এর দায় কার? পুজো কমিটির কর্তারা কোথায়? কেন গ্রেপ্তার নয়? বৃষ্টি তো পুজোতে এই প্রথম হল না। বাড়তি ভিড় দেখাতে কী করা হচ্ছিল? এই পুজো কমিটির কর্তাদের বাইরে রেখে এত বড় ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হতে পারে না। এদের নাম, পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হোক। নগরপাল কী করছিলেন? বিরোধীদের উপর দমনপীড়ন ছাড়া তাঁর পুলিশের কাজ কী? এত বড় ব্যর্থতার পর কেন নগরপাল ইস্তফা দেবেন না? না হলে বরখাস্ত করা হোক।" পরের পোস্টেই কুণাল ঘোষ লেখেন, "চোরবাগানে আগের কমিটিকে জোর করে ইস্তফা দিইয়ে নতুন কমিটি 'দখল' করা হয়েছিল। আগের কমিটির ইস্তফাপত্র এবং নতুন কমিটিতে কে কে আছেন, দেখে নিন।" মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর ফের সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হন কুণাল ঘোষ। কেন চোরবাগানের কর্তারা গ্রেপ্তার নন, প্রশ্ন তোলেন তিনি। কুণালের দাবি, "চোরবাগানের মৃত্যুমিছিল নিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য অসম্পূর্ণ, দায় এড়ানো, বিভ্রান্তিমূলক এবং নজর ঘোরানোর চেষ্টা। অবিলম্বে কমিটির কর্তাদের গ্রেপ্তার করা দরকার। নগরপাল ও ওসির অপসারণ দরকার। নিরপেক্ষ তদন্ত দরকার। কমিটিতে ভরে আছে বিজেপির লোক। তাদের আড়াল করা হচ্ছে। বৃষ্টি আজ প্রথম হল না। শুধু বৃষ্টিকে দোষ দিয়ে প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে ঢাকা দেওয়া হচ্ছে।"
প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি এই ঘটনায় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি সাংবাদিক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছেন, "কলকাতার দুর্গাপুজোর ইতিহাসে কি এই ধরনের মর্মান্তিক ঘটনা এই প্রথম ঘটল এবং প্রশাসন কি সম্পূর্ণ উদাসীন ছিল? প্রশাসনের প্রকৃত ভূমিকা কী ছিল? একদিকে, বইয়ের স্টল ভাঙার ক্ষেত্রে প্রশাসনের অতি-তৎপরতা আমরা দেখতে পাই—এমনকি বুলডোজার নামিয়ে সেগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়—অথচ ভিড় নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কোনো ইতিবাচক বা গঠনমূলক ভূমিকা চোখে পড়েনি। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও দুর্ভাগ্যজনক। মাননীয় মুখ্যমন্ত্রী বড় বড় পুজো উদ্বোধনের জন্য এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে ঘুরে বেড়িয়েছেন। আমাদের প্রশ্ন হলো, এই পুজো গুলোর জন্য কীভাবে ছাড়পত্র (মিলল এবং সেই সংক্রান্ত সমস্ত বিবরণ কি মণ্ডপের বাইরে প্রদর্শিত হয়েছিল? মুখ্যমন্ত্রী যখন সেগুলোর উদ্বোধনে গিয়েছিলেন, তখন কি এর কোনওটি তাঁর নজরে পড়েনি?" প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতির দাবি, "শুধু চোরবাগান নয়, কলকাতার অন্যান্য বেশ কিছু নামী পুজো মণ্ডপেও আজ চরম অব্যবস্থাপনার ছবি দেখা গেছে, যেখানে চৌবাগানের মতো ঘটনা ঘটার আশঙ্কা অতীতেও ছিল, এখনও আছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। আমি আবারও বলছি যে এই সংকটজনক মুহূর্তে আমরা ক্ষুদ্র রাজনৈতিক কোন্দল থেকে দূরে থাকতে চাই। মৃতদের পরিবারগুলোর জন্য যথাযথ ও পর্যাপ্ত ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে এবং পুরো ঘটনায় অবহেলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করতে একটি বিচারবিভাগীয় তদন্ত শুরু করতে হবে—এটাই আমাদের দাবি।যাঁরা প্রিয়জনদের হারিয়েছেন এবং যাঁরা আহত হয়েছেন, কংগ্রেস সবসময় তাঁদের পাশে ছিল, আজকেও আছে এবং ভবিষ্যতেও সবার পাশে থাকবে।" ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীও। তিনি এক্স প্ল্যাটফর্মে লেখেন, "কলকাতার চোরবাগান পুজো মণ্ডপে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা অত্যন্ত মর্মান্তিক। খবর পাওয়া যাচ্ছে যে এই দুর্ঘটনায় বেশ কয়েকজন মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। যাঁরা মারা গেছেন, তাঁদের পরিবারের প্রতি আমার গভীর সমবেদনা জানাই। আমি আহতদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছি। আমি প্রশাসনের কাছে আবেদন জানাচ্ছি, তারা যেন নিশ্চিত করে যে সমস্ত আহত ব্যক্তিরা অবিলম্বে সঠিক চিকিৎসা পান এবং এই ঘটনার একটি নিরপেক্ষ তদন্ত হোক, যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের ট্র্যাজেডির পুনরাবৃত্তি না ঘটে। আমি কংগ্রেস কর্মীদের ত্রাণ ও উদ্ধারকাজে সর্বতোভাবে সাহায্য করার জন্য আহ্বান জানাচ্ছি।"

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন