শ্রীরামপুর: এসআইআর (SIR) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধনের শুরু থেকেই যে আশঙ্কার কথা তিনি বারবার বলে এসেছিলেন, সেটাই আজ নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে সত্যি বলে প্রমাণিত। আর সেই হাতিয়ারকেই ঢাল করে দিল্লির দরবারে উড়ে যাওয়ার আগে বঙ্গরাজনীতির রাজপথ থেকে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে গদিচ্যুত করার সরাসরি ডাক দিলেন রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
শনিবার হুগলির শ্রীরামপুরের প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে সিইসি-র বিরুদ্ধে সুর চড়িয়ে মমতা স্পষ্ট হুঙ্কার দিলেন, “ভ্যানিশ কুমার মাস্ট গো! যত দিন না উনি যাচ্ছেন, আন্দোলন চলবে।” তবে জয়ের লক্ষ্যে এই রাজনৈতিক মেগা সভার আবহেই রণক্ষেত্রের রূপ নিল উত্তরপাড়া। সভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে তৃণমূলের প্রভাবশালী বিধায়ক কুণাল ঘোষের কনভয়ে দুষ্কৃতী হামলা, গাড়ি ভাঙচুর ও ‘ডিম থেরাপি’র ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম রাজ্য রাজনীতিতে আগুন জ্বলে উঠল।
রাজ্যের প্রায় ৯২ লক্ষ মানুষের নাম এসআইআর-এর নামে ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ার পর থেকেই নির্বাচন কমিশন ও দায়িত্বপ্রাপ্ত শীর্ষ আধিকারিক সীমা খান্নার ভূমিকা নিয়ে সরব হয়েছিল তৎকালীন শাসকদল।
সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের নিজস্ব অন্দরমহলে দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে আসতেই সেটাকে জাতীয় রাজনীতিতে 'তুরুপের তাস' বানাতে মরিয়া মমতা। শনিবার শ্রীরামপুরের সভায় দাঁড়িয়ে মমতা বলেন, “ভ্যানিশ কুমারকে যেমন ধরেছি, তেমন সমস্ত অন্যায়কারীকেই আমরা ধরব। ভোটচুরি করে জনগণের অধিকার কেড়ে নেওয়া যাবে না।”
জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণের দাবিতে আগামী সপ্তাহে দিল্লি উড়ে যাওয়ার আগে শ্রীরামপুরের মাটি থেকে মমতার এই রণহুঙ্কার জাতীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে রাজনৈতিক মহল।
তবে মমতার এই সভার আগেই উত্তরপাড়ার সখের বাজার এলাকায় ঘটে যায় নজিরবিহীন তুলকালাম। সভায় যোগ দিতে যাচ্ছিলেন দলের বর্ষীয়ান নেতা তথা বিধায়ক কুণাল ঘোষ। অভিযোগ, উত্তরপাড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনীর চোখের সামনেই তাঁর গাড়ি ঘেরাও করে রড, পাথর ও ডিম নিয়ে চড়াও হয় একদল সশস্ত্র দুষ্কৃতী।
ভাঙচুর চালানো হয় তাঁর গাড়িতে। হামলার আকস্মিকতায় সেখান থেকেই গাড়ি ঘুরিয়ে সরাসরি রাজ্য পুলিশের সদর দফতর ভবানী ভবনে হাজির হন কুণাল। ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি বলেন, “মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভায় যাতে আমি পৌঁছাতে না পারি, তার জন্যই পরিকল্পিত ভাবে এই হামলা চালানো হয়েছে।” ভবানী ভবনের সামনে নিজের ক্ষতিগ্রস্ত গাড়ি দেখিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও তীব্র নিষ্ক্রিয়তার ক্ষোভ উগরে দেন তিনি।
শ্রীরামপুর যাওয়ার পথে উত্তরপাড়ায় কুণালের ওপর হামলার খবর পেতেই গতিপথ বদলে ডানকুনি হয়ে দিল্লি রোড ধরে শ্রীরামপুর পৌঁছান প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা ঘটনাকে ‘গণতন্ত্রের অশনিসঙ্কেত’ বলে তোপ দাগেন তিনি। মমতার সুরেই হুগলির তৃণমূল আহ্বায়ক অসিত মজুমদার দাবি করেন, “দিকে দিকে তৃণমূল কর্মীদের আটকানো হচ্ছে যাতে মমতার সভায় ভিড় না হয়। সখের বাজারে কুণাল ঘোষের ওপর 'ডিম থেরাপি' ও হামলা চালিয়ে তৃণমূলের লড়াই থামানো যাবে না।”
ঘটনাকে ঘিরে ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে তীব্র রাজনৈতিক তর্জা। বিজেপির পক্ষ থেকে এই হামলার দায় সম্পূর্ণ ঝেড়ে ফেলা হয়েছে। বিজেপি নেতা রাহুল সিংহ পাল্টা দাবি করে বলেন, “তৃণমূলের আদি ও নব্যের যে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব চলছে, তার ফল এটি। বিজেপির এর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই।”
অন্যদিকে, ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় শিবিরের পক্ষে আখরুজ্জামান দাবি তোলেন, “শ্রীরামপুরের সভায় প্রচারের আলো কাড়তে কালীঘাটপন্থী তৃণমূল নিজেরাই উত্তরপাড়ায় এই নাটক করিয়েছে।” সব মিলিয়ে, সিইসি-র বিরুদ্ধে মমতার দিল্লি অভিযানের ঠিক আগের মুহূর্তেই কুণাল ঘোষের ওপর হামলা ও উত্তরপাড়ায় কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েনের ঘটনায় সরগরম হুগলি থেকে কলকাতার রাজনীতি।

শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন