মালদহ: দিল্লির রাজনীতিতে যখন এনডিএ (NDA) সরকারের বিরুদ্ধে একের পর এক সরব ভাষণ আর প্রতিবাদের ঝড় উঠছে, ঠিক তখনই পশ্চিমবঙ্গের দেখা গেল সম্পূর্ণ ভিন্ন রাজনৈতিক ছবি। হাই কোর্টের তোপ, রাজ্য পুলিশের ধরপাকড় এবং ঝাড়খণ্ডের রিসর্ট রাজনীতির সমস্ত নাটকীয়তার অবসান ঘটিয়ে মঙ্গলবার মালদহ জেলা পরিষদ দখল করল বিজেপি। আর এই জয়ের নেপথ্যে রইল ‘মমতা তৃণমূল’-এর প্রত্যক্ষ সমর্থন। পূর্ব মেদিনীপুর ও নদিয়ার পর মালদহকে ধরে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে জেলা পরিষদ দখলের হ্যাটট্রিক সারল পদ্মশিবির।
মালদহ জেলা পরিষদের মোট আসন ৪৩টি। বোর্ড গঠনের জন্য প্রয়োজন ছিল ২২ জন সদস্যের সমর্থন। মঙ্গলবার ভোটাভুটির নির্ধারিত দিনে নাটকীয় মোড় নেয় পুরো প্রক্রিয়া। সভাধিপতি নির্বাচনের সময় তৃণমূলের একাংশের জনা ছয়েক সদস্য সরাসরি বিজেপিকে সমর্থন জানান।
ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে যায় শাসকদল বিজেপি। বিজেপির রাজ্য প্রতিমন্ত্রী জোয়েল মুর্মু, দলের বিধানসভার মুখ্য সচেতক অম্লান ভাদুড়ি এবং সাংগঠনিক জেলা সভাপতিদের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে বিজেপির দীপালি বালা সভাধিপতি নির্বাচিত হন। অন্যদিকে, অভাবনীয়ভাবে সহ-সভাধিপতির পদে বসেন ‘মমতা তৃণমূল’-এর লিপিকা ঘোষ।
এই ফল নিশ্চিত হওয়ার পরেই রাজ্য রাজনীতিতে শুরু হয়েছে তীব্র শোরগোল। বিশেষ করে জাতীয় স্তরে যখন বিরোধী ঐক্য ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ইন্ডি’ জোট আন্দোলন জারি রেখেছে, ঠিক তখনই স্থানীয় স্তরে তৃণমূলের একাংশের এই ‘ভোলবদল’ নিয়ে উঠেছে নানা প্রশ্ন।
সিপিআই(এম) নেতা শতরূপ ঘোষ খোঁচা দিয়ে বলেছেন, “যাঁরা ভোটচুরির অভিযোগে সিইসি-র অপসারণ চেয়ে দিল্লিতে মিছিল করছেন, তাঁদের দলের লোকই স্থানীয় স্তরে বিজেপির সঙ্গে হাত মিলিয়ে বোর্ড গড়ছেন! এই দৃশ্যটা অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ডেকে দেখানো উচিত।” যদিও সমর্থনকারী তৃণমূল সদস্যদের সাফ বক্তব্য, “ইচ্ছে হয়েছে, তাই জেলা ও মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে সমর্থন দিয়েছি।”
এর আগে, বোর্ড গঠন ঘিরে গত কয়েক দিন ধরে মালদহে কার্যত থ্রিলার সিনেমার মতো চিত্রনাট্য তৈরি হয়। গত জুনে প্রাক্তন সভাধিপতি ও সহ-সভাধিপতির বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার পর থেকেই জটিলতার সূচনা।
তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও বেশ কিছু বিক্ষুব্ধ সদস্যকে কাছে টেনে ক্ষমতা দখলের ছক কষেছিল জেলা কংগ্রেস। কোতোয়ালির গড় সামলাতে ও নিজেদের ২৪ জন সমর্থক সদস্যকে আগলে রাখতে পাকুড়ের এক ভিনরাজ্যের রিসর্টে নিয়ে গিয়ে তোলা হয়।
নিখুঁত পরিকল্পনা ছিল, কংগ্রেসনেত্রী মৌসম বেনজির নূর ও সাংসদ ইশা খান চৌধুরীর নেতৃত্বে সদস্যরা সরাসরি এসে সাগরিকা সরকারকে সভাধিপতি হিসেবে নির্বাচিত করবেন।
কিন্তু সোমবার গভীর রাতে ট্রেনে চেপে মালদহ স্টেশনে পা রাখতেই সেই ছক বানচাল করে দেয় পুলিশ। কোনো কারণ দর্শানো ছাড়াই তিন সদস্যকে আটক করা হয়। যা নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কংগ্রেস সাংসদের ব্যাপক বচসাও হয়।
মঙ্গলবার কংগ্রেস সভাস্থল বয়কট করলে বিক্ষুব্ধ তৃণমূলের বাকি সদস্যরাও রাতারাতি রঙ বদলে বিজেপির পাশে গিয়ে দাঁড়ান। ফলে হাত শিবিরের ঘুরে দাঁড়ানোর সব আশায় জল ঢেলে বিশাল পুলিশ বাহিনীর পাহাড়ায় পদ্ম ফুটল মালদহ জেলা পরিষদে।

মঙ্গলবার, ০৬ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন