হাওড়া: ক্যালেন্ডারের পাতা বলছে আর মাত্র হাতে গোনা কয়েকটা মাস, তারপরেই মর্তে আগমন ঘটবে উমার। প্রতি বছর জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ়ের এই চড়া গরমের মরসুম থেকেই হাওড়ার ডোমজুড়ের পটুয়াপাড়ায় দিন-রাত এক করে শুরু হয়ে যায় প্রতিমা গড়ার কাজ। অথচ এবারের ছবিটা সম্পূর্ণ উল্টো এবং অত্যন্ত উদ্বেগজনক। দুর্গাপুজোর ঢাকে কাঠি পড়ার আগেই মাটির তীব্র সংকটের জেরে কার্যত থমকে গিয়েছে প্রতিমা তৈরির মূল কাজ। ডোমজুড়ের মৃৎশিল্পীদের দাবি, বিগত ২০ দিনেরও বেশি সময় ধরে প্রতিমা নির্মাণের উপযোগী বিশেষ মাটির সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। এর ফলে শুধু যে শিল্পীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ পড়েছে তা নয়, চরম উদ্বেগে দিন কাটছে কলকাতার পাশাপাশি বিভিন্ন জেলার নামী-দামী পুজো কমিটি ও উদ্যোক্তাদেরও। মৃৎশিল্পী দিলীপ মণ্ডল এই নিয়ে ক্ষোভ উগরে দিয়ে জানান, প্রতিমা তৈরির মূল উপাদান বা গঙ্গামাটি সাধারণত দক্ষিণ ২৪ পরগনার ডায়মন্ড হারবার এলাকা থেকে ট্রাক বোঝাই হয়ে আসে। কিন্তু গত তিন সপ্তাহ ধরে সেই মাটির একটা চালানও ডোমজুড়ে এসে পৌঁছায়নি। ফলে কারিগরদের বসিয়ে বসিয়ে মজুরি দেওয়া অসম্ভব হয়ে পড়ায় অনেকেই বাধ্য হয়ে কাজ ছেড়ে বাড়ি ফিরে গিয়েছেন।
পটুয়াপাড়ার অন্দরে কান পাতলে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস শোনা যাচ্ছে। এই অঞ্চলের আরেক প্রবীণ মৃৎশিল্পী বাবুরাম চিত্রকর জানান, ডোমজুড়ের পটুয়াপাড়ায় প্রায় ৪০টিরও বেশি বড় প্রতিমা তৈরির কারখানা রয়েছে এবং প্রত্যেকেই আজ একই ভয়ানক পরিস্থিতির সম্মুখীন। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, মাটির জোগানের কোনও নিশ্চয়তা না থাকায় নতুন করে আসা বহু বিগ বাজেটের পুজোর অর্ডার পর্যন্ত ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হচ্ছেন তাঁরা। উদ্যোক্তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে, মাটি না এলে সময়ে ঠাকুর সরবরাহ করা কোনওভাবেই সম্ভব হবে না। ইতিমধ্যেই পটুয়াপাড়ার বিভিন্ন স্টুডিওতে গিয়ে দেখা গেল এক করুণ দৃশ্য। মাটির প্রলেপের অভাবে লাইনে লাইনে দাঁড়িয়ে রয়েছে প্রতিমার কঙ্কালসার খড়ের কাঠামো। কিন্তু সেই কাঠামোয় মাটির প্রথম প্রলেপ বা ‘একমেটে’ করার কাজটাই শুরু করা যায়নি। এর ফলে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে প্রতিমা শেষ করার যে মারাত্মক চাপ থাকে, তা এবার আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে বলে মনে করছেন শিল্পীরা।
মাটির অভাবের পাশাপাশি মৃৎশিল্পীদের সামনে এখন আরেকটি বড় আশঙ্কার মেঘ দানা বাঁধছে। তা হলো দক্ষ কারিগরদের চিরতরে হারিয়ে ফেলা। কাজ না থাকায় কারিগররা একবার পটুয়াপাড়া ছেড়ে অন্যত্র বা ভিন রাজ্যে অন্য পেশায় চলে গেলে, পরবর্তীতে মাটি এলেও তাঁদের পুজোর মুখে ফিরিয়ে আনা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। ফলে ঐতিহ্যের এই শিল্পকে বাঁচাতে এবং বহু মানুষের রুটি-রুজির চরম ক্ষতি রুখতে এখন একমাত্র আশার আলো সরকারি হস্তক্ষেপ। ডোমজুড়ের সমস্ত পটুয়াদের আর্জি, সরকার যদি দ্রুত ডায়মন্ড হারবার থেকে মাটির এই চালান চালু করার বিষয়ে বিশেষ নজর দেয়, তবেই হয়তো এই যাত্রায় রক্ষা পাবে পুজো। অন্যথায়, ২০২৬-এর শারদোৎসবে বহু মণ্ডপ যে সময়মতো প্রতিমা ছাড়াই খাঁ খাঁ করবে, সেই আশঙ্কাই এখন তাড়া করে বেড়াচ্ছে আপামর পুজোপ্রেমী বাঙালিকে।
বিষয় : durgapuja2026 kumartulicrisis clayshortage

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৯ জুন ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন