ধূলিয়ান: রাজ্যজুড়ে নাবালিকা বিবাহ রুখতে প্রশাসনের সর্বোচ্চ স্তর থেকে কড়া বার্তা দেওয়া হয়েছিল মাত্র দিনকয়েক আগেই। রাজ্য সরকার ও প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল, আঠারো বছরের কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়া সম্পূর্ণ আইনি অপরাধ এবং এ ধরনের ঘটনায় যুক্ত থাকলে কাউকেই রেয়াত করা হবে না।
কিন্তু প্রশাসনের সেই চরম হুঁশিয়ারির পরেও যে একাংশের অসচেতনতায় কোনও বদল আসেনি। তা আরও একবার হাটে হাঁড়ি ভেঙে দিল মুর্শিদাবাদের ধূলিয়ান। গোপনে ষোলো বছরের এক নাবালিকা মেয়ের বিয়ে দেওয়ার তোড়জোর চলছিল পরিবারে। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। গোপন সূত্রের খবরে বিয়ের সানাই বাজার আগেই সেখানে উপস্থিত হয়ে বিয়ে রুখে দিল সামসেরগঞ্জ থানার পুলিশ। ঘটনাকে কেন্দ্র করে চরম চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে এলাকা জুড়ে।
ঘটনাটি ঘটেছে বুধবার রাতে মুর্শিদাবাদের ধুলিয়ান পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত গাজিনগর এলাকায়। পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ওই এলাকার বাসিন্দা ১৬ বছর বয়সি এক নাবালিকার বিয়ের আয়োজন করা হয়েছিল অত্যন্ত গোপনে। পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি সম্পূর্ণ চেপে রেখে দ্রুত বিয়ের পর্ব সেরে ফেলার পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু কোনও ভাবে সেই খবর পৌঁছে যায় জঙ্গিপুর পুলিশ জেলার অন্তর্গত সামসেরগঞ্জ থানার পুলিশের কাছে। খবর পাওয়ার পর দেরি না করে বিশাল পুলিশ বাহিনী ও ব্লক প্রশাসনের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে গাজিনগঞ্জের ওই বাড়িতে হানা দেন।
ঘটনাস্থলে পুলিশ ও বিডিও অফিসের প্রতিনিধিরা গিয়ে সঙ্গে সঙ্গেই বিয়ের সমস্ত তোড়জোড় ও আচার-অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেন। মুহূর্তের মধ্যে উৎসবের আমেজ বদলে গিয়ে গোটা এলাকায় থমথমে পরিবেশ তৈরি হয়। ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে পুলিশ নাবালিকা মেয়েটিকে উদ্ধারের পাশাপাশি তার মাকেও আটক করে থানায় নিয়ে যায়। প্রশাসনিক আধিকারিকেরা নাবালিকার পরিবার ও উপস্থিত আত্মীয়স্বজনদের মুখোমুখি বসিয়ে আঠারো বছরের কম বয়সে মেয়েদের বিয়ে দেওয়ার গুরুতর আইনি পরিণতি সম্পর্কে সবিস্তারে সচেতন করেন।
প্রসঙ্গত, প্রশাসনিক এক পর্যালোচনা বৈঠক থেকে স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী নাবালিকা বিবাহ নিয়ে অত্যন্ত কড়া বার্তা দিয়েছিলেন। রাজ্য জুড়ে রূপশ্রী ও কন্যাশ্রীর মতো নানা জনকল্যাণমূলক প্রকল্প চলা সত্ত্বেও কী ভাবে বহু গ্রামীণ এলাকায় এখনও গোপনে নাবালিকা বিয়ের অশুভ প্রথা টিকে রয়েছে, তা নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন মুখ্যমন্ত্রী। কড়া ভাষায় তিনি হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন যে, নাবালিকা বিয়ে রুখতে স্থানীয় পুলিশ ও পঞ্চায়েত প্রশাসনকে আরও বেশি সক্রিয় হতে হবে এবং আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ও আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীর সেই বার্তার ৪৮ ঘণ্টা পার হতে না হতেই ধূলিয়ানের এই ঘটনা প্রমাণ করে দিল যে, কঠোর প্রশাসনিক নজরদারি সত্ত্বেও সমাজ থেকে এই ব্যাধি দূর করতে সচেতনতার শিকড় এখনও কতটা দুর্বল।
সামসেরগঞ্জ থানা সূত্রের খবর, এই অবৈধ বিয়ের আয়োজনের সঙ্গে পরিবারের বাইরে আর কারা জড়িত ছিল, বরপক্ষ বা পাত্রের পরিবারের কার ভূমিকা কী ছিল, তা গভীরভাবে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। পুরো বিষয়টি নিয়ে পুলিশ ইতিমধ্যেই একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত শুরু করেছে। আটক ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি নাবালিকাকে প্রয়োজনীয় সামাজিক ও মানসিক সুরক্ষা দিতে জেলা চাইল্ড লাইনের সঙ্গেও যোগাযোগ করা হচ্ছে।

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন