৪৫ ফুট উঁচু রথ আর ১৬টি চাকা! জগন্নাথের ‘নন্দীঘোষ’ ও ‘শঙ্খচূড়া’ রশির এই অদ্ভুত রহস্য জানেন তো?
পুরী: ‘রথস্থ বাম নং দৃষ্টা পুনর্জন্ম ন বিদ্যতে’— শাস্ত্রে বলা হয়, রথের ওপর আসীন খর্বাকৃতি বামন জগন্নাথদেবকে দর্শন করলে আর পুনর্জন্ম হয় না। আর এই বিশ্বাসকে বুকে নিয়েই আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দ্বিতীয়া তিথিতে প্রতি বছরের মতো এবারও ভারত-সহ বিশ্বজুড়ে সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার পবিত্র রথযাত্রা উৎসব। প্রাচীন ভারতীয় গ্রন্থ ‘ব্রহ্মাণ্ডপুরাণ’ ও ‘পদ্মপুরাণে’ও এই মহোৎসবের উল্লেখ পাওয়া যায়। ওড়িশার পুরীর জগদ্বিখ্যাত ‘শ্রীক্ষেত্র’-এ তিন ভাই-বোনের মাসি গুণ্ডিচার বাড়ির এই যাত্রাকে কেন্দ্র করে মাতোয়ারা ভক্তকূল। তবে এই রথযাত্রার মূল আকর্ষণ হলো মহাপ্রভুর তিনটি সুবিশাল ও অলৌকিক রথ, যাদের তৈরির ইতিহাস ও বৈশিষ্ট্য জানলে রীতিমতো তাজ্জব বনে যেতে হয়।[TECHTARANGA-POST:11007]রথযাত্রার দিন নিয়ম মেনে সবার প্রথমে যাত্রা শুরু করে বড় ভাই বলরাম বা বলভদ্রের রথ। নীল রঙের আবরণযুক্ত ৪৪ ফুট উঁচু এই বিশেষ রথটির নাম ‘তালধ্বজ’। মোট ৭৬৩টি কাঠের টুকরো দিয়ে তৈরি এবং লাল ও সবুজ কাপড়ে সাজানো এই রথটিতে রয়েছে ৬ ফুট ব্যাসের ১৪টি চাকা। এই রথের রশির নাম ‘বাসুকি নাগ’, যার সারথি হলেন সাত্যকি এবং রক্ষী বাসুদেব। কার্তিক, গণেশ ও মৃত্যুঞ্জয়-সহ মোট ৯ জন দেবতা সওয়ার হন বড় ভাইয়ের রথে। এর পরেই যাত্রা শুরু করে বোন সুভদ্রার রথ, যার নাম ‘দর্পদলন’। রথের পতাকায় পদ্মচিহ্ন থাকায় একে অনেকে ‘পদ্মধ্বজ’-ও বলে থাকেন। প্রায় ৪৩ ফুট উঁচু এবং ১২ চাকার এই রথটি লাল ও কালো কাপড়ে সাজানো হয়, যার সারথির ভূমিকায় থাকেন অর্জুন। ‘স্বর্ণচূড়া নাগুনি’ নামের রশিতে টানা এই রথে চণ্ডী, চামুণ্ডা ও বনদুর্গা-সহ ৯ জন দেবী অবস্থান করেন।[TECHTARANGA-POST:10995]সবশেষে ভক্তদের জয়ধ্বনিতে চারদিক কাঁপিয়ে রাজকীয় মেজাজে রাজপথ কাঁপাতে নামে খোদ জগন্নাথদেবের প্রধান রথ। হলুদ এবং সোনালি রঙের এই রথটির নাম ‘নন্দীঘোষ’। ৪৫ ফুট উচ্চতার এই সুবিশাল রথটি দাঁড়িয়ে থাকে ৭ ফুট ব্যাসের মোট ১৬টি চাকার ওপর, যা তৈরি করতে প্রয়োজন হয় ৮৩২টি কাঠের টুকরো। এই রথের প্রধান আকর্ষণ হলো এর টানার রশি, যার নাম ‘শঙ্খচূড়া নাগুনি’। ৪টি শক্তিশালী ঘোড়া এবং মিতালি নামের সারথির পরিচালনায় এগিয়ে চলা এই নন্দীঘোষে মদনমোহনের সঙ্গে সওয়ার হন গোবর্ধন, কৃষ্ণ, নরসিংহ ও হনুমান-সহ ৯ জন দেবতা। এই রথের মাথায় উড়তে থাকা ‘ত্রৈলোক্যমোহিনী’ পতাকার দর্শন ও শঙ্খচূড়া রশিতে হাত দিয়ে টান দেওয়াকেই সনাতন ধর্মে পরম পুণ্য কর্ম বলে মনে করা হয়, যা দেখার জন্য প্রতি বছর পুরীর রাজপথে আছড়ে পড়ে লাখো মানুষের ঢল।