By Election 2026: দুই উপনির্বাচনে ভোটের জটিল অঙ্ক, তৃণমূল তাকিয়ে দিল্লির দিকে!
কলকাতা: একটি বিধানসভা আসন, অথচ লড়াইয়ে নাম একগুচ্ছ রাজনৈতিক দলের। কিন্তু শেষ পর্যন্ত শেষ হাসি ফুটবে তো কেবল একজনের মুখেই! তা হলে বাকি প্রতিদ্বন্দ্বীদের বাক্সে যাওয়া ভোটগুলোর ভাগ্যে কী জুটবে? আরও স্পষ্ট করে বললে, একই দলের দুই ভিন্ন মেরুর গোষ্ঠী যদি একে অপরের বিরুদ্ধে খোলা ময়দানে আমনে-সামনে দাঁড়ায়, তবে সেই টানাপোড়েনের নিট ফল কি শাসক দলের ঘরেই উঠবে, নাকি ফাঁক গলে বাজিমাত করে যাবে তৃতীয় কোনও শিবির?নন্দীগ্রাম এবং রেজিনগরের আসন্ন উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে এখন এমনই লাখ টাকার প্রশ্নে তোলপাড় রাজ্য রাজনীতি। সচরাচর যে কোনও সাধারণ নির্বাচনে দু’টি প্রধান শিবিরের মুখোমুখি লড়াইয়ে রাজনৈতিক সমীকরণ অনেকটাই সোজা থাকে। কিন্তু যখনই লড়াইটা বহু মেরুতে বিভক্ত হয়ে যায়, তখনই সাধারণ পাটিগণিতের সমস্ত হিসাব-নিকাশ উল্টেপাল্টে যেতে বসে। আসন্ন এই জোড়া উপনির্বাচনে কেবল বিরোধী দল বনাম বিজেপির লড়াই নয়, কিংবা তৃণমূল বনাম বাম-কংগ্রেস জোটে সীমাবদ্ধ নেই মূল চিত্র। সঙ্গে যুক্ত হয়েছে একই দলের দুই গোষ্ঠীর পৃথক অবস্থান, রাম-বাম-কংগ্রেসের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব এবং নন্দীগ্রামের প্রেক্ষাপটে আইএসএফের মতো নির্ণায়ক শক্তির উপস্থিতি। অর্থাৎ, প্রার্থীর সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখন প্রশ্ন একটাই, ‘কে কত ভোট পাচ্ছেন’ তার চেয়েও বড় হয়ে উঠেছে ‘কার ভোট কে কাটছেন!’ভারতের 'ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট' বা সর্বাধিক ভোট পাওয়া প্রার্থীর জয়ী হওয়ার নির্বাচনী ব্যবস্থায় এক অদ্ভুত জটিলতা রয়েছে। এখানে জয় নিশ্চিত করতে ৫০ শতাংশ ভোট পাওয়ার কোনও বাধ্যবাধকতা নেই। ধরা যাক, কোনও আসনে চার প্রার্থীর মধ্যে একজন ৩২ শতাংশ ভোট পেলেন, আর বাকি ৬৮ শতাংশ ভোট ভাগ হয়ে গেল ২৮, ২২ ও ১৮ শতাংশে। সে ক্ষেত্রে মাত্র ৩২ শতাংশ ভোট পাওয়া প্রার্থীই জয়ী হিসেবে ঘোষিত হবেন। যদিও ওই আসনের ৬৮ শতাংশ মানুষ তাঁকে প্রত্যাখ্যান করেছেন! নন্দীগ্রাম ও রেজিনগরে কি এবার ঠিক এই কৌশলগত বা 'ট্যাকটিক্যাল' ভোটিংয়ের প্রভাব দেখা যাবে?ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, ২০২৩ সালের সাগরদিঘি উপনির্বাচন ত্রিমুখী লড়াইয়ের এক চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত তৈরি করেছিল। সেখানে তৃণমূল, বিজেপি ও কংগ্রেসের লড়াইতে প্রায় ৪৭.৩৫ শতাংশ ভোট নিয়ে জয়ী হন কংগ্রেসের বায়রন বিশ্বাস। যেখানে ২০২১ সালে ৫১ শতাংশ ভোট পাওয়া শাসক দল নেমে আসে ৩৪.৯৪ শতাংশে। অর্থাৎ, উপনির্বাচনে মানুষ কেবল সরকার গড়তে ভোট দেন না, তাঁদের ভোটিং প্যাটার্নে কাজ করে স্থানীয় ইস্যু, প্রার্থীর গ্রহণযোগ্যতা এবং দলীয় ক্ষোভ।নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক ইতিহাস বহু মোড় ঘোরানো মুহূর্তের সাক্ষী। ২০০৯ সালের উপনির্বাচনে সিপিআই বিধায়ক মহম্মদ ইলিয়াসের পদত্যাগের পর ফিরোজা বিবি জয়ী হয়ে পরিবর্তনের সূচনা করেছিলেন। আবার ২০২১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও শুভেন্দু অধিকারীর হাইভোল্টেজ লড়াই দেখেছে এই মাটি। ২০২৬-এর প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল। একদিকে মমতা শিবিরের প্রভাব, অন্যদিকে ঋতব্রত শিবিরের নিজস্ব অবস্থান, পাশাপাশি বিজেপি, বাম, কংগ্রেস ও আইএসএফ, সব মিলিয়ে ভোটের পরিসংখ্যান কোন দিকে ঢলে পড়বে, তা নিয়ে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে টানাটানি শুরু হয়েছে।পরিসংখ্যানের একটি সম্ভাব্য চিত্র ভাবা যাক। ধরা যাক, শাসক দলের ভোটব্যাঙ্ক দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে মমতা শিবির পেল ২৩ শতাংশ এবং ঋতব্রত শিবির পেল ১৭ শতাংশ। অপর দিকে বিজেপি যদি সংহত অবস্থায় ৩০ শতাংশ ভোট ধরে রাখতে পারে, তবে বিরোধী শিবিরের ভোট বিভাজনের ফায়দা সরাসরি চলে যাবে তাদের ঝুলিতে। আবার এর ঠিক উল্টো চিত্রও দেখা যেতে পারে, যদি ভোটাররা শেষ মুহূর্তে মেরুকরণের রাজনীতি বুঝে কোনো নির্দিষ্ট একটি শিবিরের পেছনে শক্ত হয়ে দাঁড়ান।একই অঙ্ক প্রযোজ্য রেজিনগরের ক্ষেত্রেও। সেখানেও শাসক দলের অন্তর্দ্বন্দ্বে ক্যান্ডিডেট ফ্যাক্টর বা প্রার্থীর ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি বড় হয়ে উঠতে পারে। আবার বহু প্রার্থীর লড়াইয়ে 'সেকেন্ড চয়েস' বা দ্বিতীয় পছন্দের প্রার্থী নির্বাচনও বড় ভূমিকা নেয়। কোনও দল হয়তো নির্বাচনে জয়ী হলো না, কিন্তু ২০-২৫ শতাংশ ভোট নিজেদের ঝুলিতে পুরে নিয়ে মূল দলকে কড়া রাজনৈতিক বার্তার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিল, এমন নজিরও রাজ্য রাজনীতিতে বিরল নয়।২০২৪ সালের মানিকতলা, রানাঘাট দক্ষিণ, বাগদা ও রায়গঞ্জের চার উপনির্বাচনে তৎকালীন শাসক দল একচ্ছত্র জয় পেলেও, বর্তমান বহুমুখী লড়াইয়ের সমীকরণ পুরোপুরি ভিন্ন। ৬ অক্টোবর ভোটগ্রহণ এবং ৯ অক্টোবর গণনার পর স্পষ্ট হবে, কার ভোট কোন বাক্সে গেল এবং কারা নিজেদের ভোটব্যাঙ্ক বাঁচাতে পারল। কারণ এই বহুমুখী যুদ্ধে হয়তো বেশি ভোট পাওয়া নয়, বরং নিজের মূল ভোটব্যাঙ্ক কম হারাটাই জয়ের আসল চাবিকাঠি হতে চলেছে। যদিও এই অঙ্ক না কষে নন্দীগ্রামে এদিন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী দাবি করেছেন, বাংলার দুটি কেন্দ্রেই জামানত বাজেয়াপ্ত হবে বিরোধীদের। কারণ, তিনি ভোট করাতে জানেন। আর নন্দীগ্রামে যে ভোটে বিজেপি প্রার্থী জিতবেন, তা বাংলার মানুষ কোনও দিন কল্পনা করতে পারেনি। এই অবস্থায় কাল, বুধবার মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষদিন। এই দিনেই তৃণমূলের দুই শিবিরের নজর দিল্লির নির্বাচন কমিশনের দিকে। কারণ, কালই হতে পারে ফয়সালাষ। জোড়া ফুল তুমি কার ?