কলকাতা: গত কয়েক বছরে চরম দুর্নীতি ও পরিকাঠামোগত ব্যর্থতায় রাজ্যজুড়ে স্কুলশিক্ষার মান যে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, অবশেষে সে কথা প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শনিবার নিউ টাউনের বিশ্ব বাংলা কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত রাজ্য সরকারের ‘বিদ্যাসাগর শিক্ষক সম্মান’ প্রদান অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি সাবেক তৃণমূল কংগ্রেস আমলের শিক্ষা ব্যবস্থার কড়া সমালোচনা করেন।
মুখ্যমন্ত্রী স্পষ্ট জানান, বিগত সরকারের সময়কার ব্যাপক চাকরি দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে রাজ্যের শিক্ষাব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল, যার মাশুল গুনতে হয়েছে পড়ুয়াদের। ভেঙে পড়া সেই শিক্ষা ব্যবস্থাকে পুনরুজ্জীবিত করতেই এবার শিক্ষক দিবসের মঞ্চ থেকে একাধিক মেগা প্রকল্পের ঘোষণা করলেন তিনি।
শিক্ষক দিবসের বিশেষ অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, গত কয়েক বছরে রাজ্যের পড়ুয়ারা জাতীয় মানচিত্র থেকে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে। স্কুলের সার্বিক পরিবেশ ও পঠনপাঠনের মান ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। এদিনের অনুষ্ঠান থেকেই কেন্দ্রীয় সরকারের ‘পিএম শ্রী’ প্রকল্পের আদলে রাজ্যে ‘সিএম শ্রী’ (মুখ্যমন্ত্রী শ্রী) ইনস্টিটিউট চালুর এক ঐতিহাসিক ঘোষণা করেন শুভেন্দু অধিকারী।
প্রতিটি জেলায় দুটি করে 'সিএম শ্রী' ইনস্টিটিউট
মুখ্যমন্ত্রী জানান, প্রাথমিক পর্যায়ে রাজ্যের প্রতিটি জেলায় দুটি করে মডেল স্কুল বা ‘সিএম শ্রী’ ইনস্টিটিউট গড়ে তোলা হবে। জওহর নবোদয় বিদ্যালয়ের মতোই ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে স্বচ্ছ প্রবেশিকা পরীক্ষার মাধ্যমে এই স্কুলগুলিতে মেধাবী পড়ুয়াদের ভর্তি নেওয়া হবে।
আধুনিক পরিকাঠামো: কেন্দ্রশাসিত সেন্ট্রাল স্কুলের আদলে গড়ে ওঠা এই স্কুলগুলিতে থাকবে স্মার্ট ক্লাসরুম, অত্যাধুনিক ডিজিটাল ল্যাবরেটরি এবং সর্বাধুনিক পঠনপাঠন সামগ্রী।
সেরা শিক্ষক ও নিয়োগ: এই মডেল স্কুলগুলিতে সর্বোচ্চ মানের শিক্ষক-শিক্ষিকা নিয়োগ করা হবে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে ‘স্বামী বিবেকানন্দ মেরিট স্কলারশিপ’ প্রক্রিয়াকেও আরও স্বচ্ছ ও জোরদার করা হবে বলে তিনি আশ্বাস দেন।
অতীতের অবহেলা ও সাপের কামড় প্রসঙ্গ
বিগত তৃণমূল সরকারের তীব্র সমালোচনা করে শুভেন্দু অধিকারী অভিযোগ করেন, গত তিন বছর ধরে রাজ্যের স্কুলগুলি সামান্যতম ‘কম্পোজিট গ্রান্ট’-এর টাকা পর্যন্ত পায়নি। ফলে সামান্য ব্লিচিং পাউডার বা কার্বলিক অ্যাসিড কেনার টাকাও ছিল না স্কুল কর্তৃপক্ষের হাতে। সম্প্রতি কলকাতার ঐতিহাসিক মিত্র ইনস্টিটিউশনে এক ছাত্রের সর্পদষ্ট হওয়ার চাঞ্চল্যকর ঘটনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, “স্কুলে সাপে কামড়ানোর মতো ঘটনা অভাবনীয় হলেও দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো, পরিকাঠামোর অভাবেই আজ এই হাল। গত ৩ বছর ধরে ১ টাকাও গ্রান্ট মেলেনি, ফলে প্রতিদিনের রক্ষণাবেক্ষণ বন্ধ হয়ে পড়েছিল।”
স্বচ্ছ নিয়োগ পদ্ধতি ও পাঠ্যক্রম বদল
ক্ষুণ্ণ হওয়া প্রশাসনিক ভাবমূর্তি ফেরাতে সুপ্রিম কোর্ট ও হাইকোর্টের নির্দেশ মেনেই দ্রুত শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী নিয়োগের আশ্বাস দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। ঘণ্টা বাজানো থেকে শুরু করে সাইকেল স্ট্যান্ডের কর্মী—সকল পদে দ্রুত স্বচ্ছ নিয়োগ হবে। দুর্নীতির রাস্তা পুরোপুরি বন্ধ করতে এসএসসি-কে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যেন ইন্টারভিউ বা মৌখিক পরীক্ষায় ৫ নম্বরের বেশি না রাখা হয়। পাশাপাশি, তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন যে ইতিহাস বিকৃতি ঠেকাতে আগের সরকারের সময়ের বিতর্কিত ‘টাটা-বিতাড়ন’ সংক্রান্ত অংশ পাঠ্যপুস্তক থেকে পাকাপাকিভাবে বাদ দেওয়া হচ্ছে।
ক্রীড়াক্ষেত্রে ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স’
শুধু পঠনপাঠনই নয়, শারীরিক ও ক্রীড়া শিক্ষার মান বাড়াতে উত্তরবঙ্গ ও পশ্চিমাঞ্চলে দুটি ‘সেন্টার অফ এক্সেলেন্স ইন স্পোর্টস’ গড়ে তোলার কথা বলেন তিনি। স্কুল সার্ভিস কমিশনের (SSC) মাধ্যমে দ্রুত স্পোর্টস ট্রেনার, শারীরশিক্ষার শিক্ষক ও ফিজিক্যাল ইনস্ট্রাক্টর নিয়োগের পথ সুগম করা হচ্ছে। একইসঙ্গে ব্রতচারী, ফুটবল এবং ভারতের প্রাচীনতম খেলা খো-খো ও হাডুডুকে পুনরায় বিদ্যালয় স্তরে বাধ্যতামূলক করার ওপর জোর দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ

শনিবার, ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন