নয়াদিল্লি: দিল্লির ভারত মণ্ডপমে আয়োজিত আঠারোতম ব্রিকস (BRICS) শীর্ষ সম্মেলনের সমাপ্তি দিনে প্রযুক্তি ও সংকটপূর্ণ খনিজ পদার্থকে (Critical Minerals) অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার বিরুদ্ধে কড়া হুঁশিয়ারি দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান সহ সদস্য দেশগুলির রাষ্ট্রপ্রধানদের উপস্থিতিতেই বিশ্ব বাণিজ্য ও সাপ্লাই চেন সচল রাখার বার্তা দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরাসরি নাম না করলেও কৌশলগত এই খনিজ সম্পদের একচেটিয়া বাজারে আধিপত্য বিস্তারকারী চিনকে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন নরেন্দ্র মোদী।
প্রযুক্তি ও খনিজ নিয়ে শি জিনপিংয়ের সামনেই মোদীর বার্তা
রবিবার সম্মেলনের দ্বিতীয় দিনে উদ্বোধনী ভাষণে বিশ্বজুড়ে তৈরি হওয়া ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা এবং অর্থনৈতিক সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, "বিশ্বজুড়ে ক্রমাগত বাড়তে থাকা উত্তেজনা সাধারণ মানুষের জীবনে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মহামারী, জলবায়ু পরিবর্তন কিংবা সরবরাহ শৃঙ্খলে বাধার মতো সংকট প্রমাণ করেছে যে, আজকের বিশ্বায়িত যুগে কোনো সমস্যাই একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।"
এর পরেই সংকটপূর্ণ খনিজ ও প্রযুক্তির অবাধ সরবরাহের দাবিতে সরব হন মোদী। চিনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে সামনে বসিয়েই তিনি সতর্ক করেন, প্রযুক্তি এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল খনিজ সম্পদকে যেন কোনো দেশ রাজনৈতিক কৌশল বা অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার না করে।
তেমনটা হলে বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক অগ্রগতির যে জোয়ার এসেছে, তা এক নিমেষে ধূলিসাৎ হয়ে যেতে পারে। সম্প্রতি আমেরিকা-ইরান সংঘাতের কারণে 'স্ট্রেইট অব হরমুজ'-এ বাণিজ্য ব্যাহত হওয়া এবং কোভিড মহামারীর উদাহরণ টেনে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংকট মোকাবিলার জন্য ব্রিকসভুক্ত দেশগুলিকে একসঙ্গে প্রস্তুতি নিতে হবে। ভারতের সভাপতিত্বে ‘রেজিলিয়েন্স, ইনোভেশন, কো-অপারেশন এবং সাস্টেইনেবিলিটি’—এই চার স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে এক যৌথ নির্দেশিকা ও সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম তৈরিতেও সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।
গালওয়ান বিতর্ক ভুলে উষ্ণ সখ্য ও 'ফ্যামিলি ফটো'
গুরুগম্ভীর বার্তা ও উদ্বেগের পাশাপাশি এই সম্মেলন যেন হয়ে উঠেছিল বিশ্বনেতাদের এক আন্তরিক ‘ফ্যামিলি রিইউনিয়ন’। দুই দিনব্যাপী এই সম্মেলনের শুরু থেকেই প্রধানমন্ত্রী মোদী এবং চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্পর্কের রসায়ন নজর কেড়েছে কূটনৈতিক মহল। গালওয়ান উপত্যকার রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চরম তিক্ততা ভুলে দুই রাষ্ট্রপ্রধানকে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ মেজাজে কথা বলতে দেখা যায়।
এমনকি একটি পর্বে বক্তৃতা চলাকালীন চিনা প্রেসিডেন্ট জিনপিংয়ের আসনে কিছু শারীরিক বা কারিগরি অসুবিধা হচ্ছে লক্ষ্য করা মাত্রই ভাষণ মাঝপথে থামিয়ে দেন মোদী। জিনপিংয়ের দোভাষীর কাছে গিয়ে সব ঠিক আছে কি না খোঁজ নেন এবং তাঁর স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত হওয়ার পর প্রায় ৩০ সেকেন্ড পর পুনরায় ভাষণ শুরু করেন। এই সৌজন্যের পাশাপাশি ভারত মণ্ডপমে ব্রিকস রাষ্ট্রপ্রধানদের বার্ষিক ‘ফ্যামিলি ফটো’ তোলার সময় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একদিকে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবং অন্যদিকে চিনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বর্তমান ভারতের অবস্থান ও নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্ব যে কতটা প্রভাব বিস্তারকারী, এই ছবিকেই তার অন্যতম বড় প্রমাণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
'নয়াদিল্লি ঘোষণা' ও প্রস্তাব
সম্মেলন শেষে ব্রিকসের যৌথ ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ (New Delhi Declaration) প্রকাশ করা হয়। এতে মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ও গাজায় মানবিক সংকটে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। পাশাপাশি, স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের সমর্থনে ‘টু-স্টেট সলিউশন’ সুনিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন দেশের ওপর আরোপিত একতরফা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ও সংরক্ষণবাদী নীতির তীব্র বিরোধিতা করেছে ব্রিকস ভুক্ত দেশগুলি। শীর্ষ সম্মেলন সফলভাবে সম্পন্ন করে এ দিনই দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, নাইজেরিয়া সহ একাধিক দেশের শীর্ষপ্রধানদের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ
বিষয় : HiddenStoriesNews

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন