কলকাতা ও রেজিনগর: নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণের পরিবর্তনের পর এ বার মুর্শিদাবাদের রেজিনগরকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে রাজ্য রাজনীতির মূল স্রোত। বিধানসভা উপনির্বাচনের ময়দানে কার্যত ‘প্রেস্টিজ ফাইট’ ধরে রাখতে সমস্ত শক্তি উজাড় করে ঝাঁপাতে চলেছে মমতা তৃণমূল কংগ্রেস। সব থেকে বড় চমক, দীর্ঘ ১৫ বছর পর কোনও বিধানসভা উপনির্বাচনের প্রচারে সরাসরি জনসভায় নামছেন খোদ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সঙ্গে থাকবেন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও। রেজিনগরে দলীয় প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরীকে জেতাতে মমতা-অভিষেকের পাশাপাশি নামছে মমতা তৃণমূলের বিরাট বাহিনী। রবিবার প্রকাশিত ২০ জনের ‘স্টার ক্যাম্পেনার’ বা তারকা প্রচারকের তালিকা ঘিরে ইতিমধ্যেই রেজিনগরের পারদ চড়তে শুরু করেছে।
রেজিনগর যে এখন স্রেফ একটি সাধারণ উপনির্বাচন নয়, বরং অস্তিত্ব ও মর্যাদার লড়াই, তা স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল আগেই। নন্দীগ্রামে তৃণমূল সমর্থিত প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর সেখানে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থন জানানোর সিদ্ধান্ত নেয় মমতা শিবির। এর পর থেকেই রেজিনগরে তৃণমূলের কৌশল কী হবে, তা নিয়ে রাজ্য রাজনীতিতে জোর জল্পনা তৈরি হয়। সমস্ত সংশয় কাটিয়ে প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী জানিয়ে দেন, তিনি দলীয় প্রতীক নিয়েই লড়ছেন। এর পরেই রেজিনগরকে মমতা শিবিরের ‘শিবরাত্রির সলতে’ হিসেবে ধরে নিয়ে সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামার সিদ্ধান্ত নেয় তৃণমূল নেতৃত্ব। সচরাচর উপনির্বাচনের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সরাসরি জনসভা করতে দেখা যায় না। দেড় দশক আগের সেই প্রথা ভেঙে রেজিনগরে তাঁর এই পদার্পণকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছেন।
রবিবার দুপুরে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রকাশিত ২০ জনের তারকা প্রচারকের তালিকায় চোখ রাখলেই বোঝা যায় প্রচারের রূপরেখা। তৃণমূল সূত্রে খবর, বিদেশ সফর থেকে ফিরে এসেই সোজা রেজিনগরের প্রচারের ময়দানে যোগ দেবেন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। এ ছাড়া এই তালিকায় রয়েছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, সৌগত রায়, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়, দোলা সেন, মহুয়া মৈত্র, সামিরুল ইসলাম, কুণাল ঘোষ, বাবর আলি, উপাসনা চৌধুরী ও প্রিয়াঙ্কা অধিকারীদের মতো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মুখেরা। আগামী ৬ অক্টোবর রেজিনগরে উপনির্বাচনের ভোটগ্রহণ। কবে থেকে এই হেভিওয়েট নেতারা ময়দানে নামবেন তার দিনক্ষণ নির্দিষ্ট করা না হলেও, তালিকা প্রকাশের পর থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে দিয়েছে স্থানীয় নেতৃত্ব।
এক দিকে যখন তৃণমূলের নক্ষত্র সমাবেশ ঘটিয়ে প্রচারঝড় তোলার প্রস্তুতি চলছে, ঠিক তখনই বিরোধী শিবিরে দেখা দিয়েছে চরম নাটকীয়তা। রবিবার রেজিনগরের সরাসরি ভোট প্রচারের ময়দান থেকে আচমকাই সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেছেন ‘আম জনতা উন্নয়ন পার্টি’-র চেয়ারম্যান হুমায়ুন কবীর এবং দলের প্রার্থী তথা তাঁর পুত্র গোলামনবি আজাদ রবিন।
পুলিশি হেনস্থা ও মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর গুরুতর অভিযোগ তুলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন নওদার বিধায়ক হুমায়ুন কবীর। তাঁর দাবি, "আমরা রাস্তায় নেমে প্রচার করলেই পুলিশ বেছে বেছে দলের কর্মীদের গ্রেফতার করছে। শনিবার রাতেই রেজিনগর ও শক্তিপুর থানার পুলিশ আমার চার জন গুরুত্বপূর্ণ দলীয় পদাধিকারীকে গ্রেফতার করেছে।" কর্মীদের নিরাপত্তার স্বার্থেই শারীরিক ভাবে প্রচারের ময়দানে না থাকার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন জানিয়ে তিনি বলেন, "এমসিসি লাগু থাকা সত্ত্বেও পুলিশ নিরপেক্ষ কাজ করছে না। এটা গণতন্ত্রের হত্যা। তাই রাজ শক্তির অপব্যবহারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আমরা আর মাঠে নামব না।" হুমায়ুন জানান, এ বার প্রচার সীমাবদ্ধ থাকবে সমাজমাধ্যমের পাতায় এবং বাড়ি বাড়ি দলীয় প্রতীক ‘টেবিল’ ছাপিয়ে পৌঁছে দেওয়ার মধ্যে। পিতার এই সিদ্ধান্তে পূর্ণ সম্মতি জানিয়েছেন প্রার্থী গোলাম নবী আজাদ রবিনও।
যদিও আম জনতা উন্নয়ন পার্টির এই সিদ্ধান্তকে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব দিতে নারাজ বিজেপি। বহরমপুর সাংগঠনিক জেলা বিজেপির সভাপতি মলয় মহাজন কটাক্ষ করে জানান, কে কীভাবে প্রচার করবেন বা ময়দান ছাড়বেন তা তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয়, এই নিয়ে বিজেপির কিছু বলার নেই।
সব মিলিয়ে, আগামী ৬ অক্টোবরের আগে রেজিনগর এখন রাজনৈতিক উত্তেজনায় ফুটছে। এক দিকে তৃণমূলের নক্ষত্রপুঞ্জের প্রচারের তোড়জোড়, অন্য দিকে স্থানীয় সমীকরণের নাটকীয় মোড় দেড় দশক পর উপনির্বাচনের প্রচারে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ফেরা রেজিনগরের ফলাফলকে কোন দিকে মোড় ঘোরায়, এখন সে দিকেই নজর গোটা রাজ্যের।

রোববার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন