জলপাইগুড়ি: ঘড়ির কাঁটায় তখন রাত শেষের প্রহর।
একে একে পটকার বিকট শব্দে কেঁপে উঠছে উত্তরবঙ্গের তিস্তাপারের শহর জলপাইগুড়ি। আর সেই রাতভোর শব্দের বাজনা পেরিয়ে ভোরের আলো ফুটতেই তিস্তার শুভ্র কাশফুলের চরে হিমশীতল জলে পূর্বপুরুষের উদ্দেশে অঞ্জলি।
মহালয়ার ভোরে কলকাতার গঙ্গাঘাট কিংবা দক্ষিণের আড়ম্বরের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা, জলপাইগুড়ির আকাশ-বাতাসে তখন এক অন্য সনাতনী আবহ। প্রায় পাঁচশো বছরের এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজও সমান স্বমহিমায় বয়ে চলেছে তিস্তাপারের এই জনপদে।
স্থানীয় ইতিহাস ও প্রবীণদের বয়ান অনুযায়ী, জলপাইগুড়ি ও তার আশপাশের বিস্তীর্ণ বনাঞ্চল একসময়ে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারসহ নানা হিংস্র বন্যপ্রাণীর অবাধ বিচরণক্ষেত্র ছিল। সেই আমলে ঐতিহাসিক বৈকুণ্ঠপুর রাজবাড়ির তত্ত্বাবধানে ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে জনবসতি।
সেকালে বিদ্যুতের আলোর সুযোগ না থাকায় রাতের অন্ধকারে নদীর ঘাট কিংবা দীঘির পাড়ে তর্পণে যাওয়া ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। একদিকে গাঢ় অন্ধকার, অন্যদিকে বন্যপ্রাণীর অতর্কিত আক্রমণের আশঙ্কা, এই বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতেই রাতের অন্ধকারে পটকা বা আতসবাজি ফাটিয়ে বন্যপ্রাণীদের নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে রাখার নিয়ম চালু হয়েছিল।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে শহরের চেহারা পাল্টেছে, জঙ্গল কমেছে, এসেছে পাকা রাস্তা আর আধুনিক আলোর ঝলকানি। কিন্তু প্রাচীন সেই রীতির রোমাঞ্চকর স্মৃতি আজ ২০২৬ সালেও জলপাইগুড়ির সাংস্কৃতিক সত্তায় গভীরভাবে গেঁথে রয়েছে।
শুধু কোনও ধর্মীয় আচার নয়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা এই রাতভর পটকাবাজি ও ভোরের তর্পণ আজ জলপাইগুড়ির নিজস্ব স্বকীয় পরিচয়ের প্রতীক। মহালয়ার ভোরে তিস্তার হিমশীতল জলে তর্পণের মধ্য দিয়ে একদিকে যেমন পিতৃপক্ষের অবসান ও দেবীপক্ষের শুভ সূচনা ঘটল, অন্যদিকে ৫ শতাব্দীর এই ঐতিহ্য ফের একবার স্মরণ করিয়ে দিল উত্তরবঙ্গবাসীর শেকড়ের টানকে।

শনিবার, ১০ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১০ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন