কলকাতা : দুর্গাপুজোর পাস কেলেঙ্কারি ও আর্থিক তছরুপের তদন্তে এবার নজিরবিহীন মোড়!
রাজ্যের প্রশাসনিক ক্ষমতার পরিবর্তন এবং তৎকালীন সরকারের একাধিক দুর্নীতির অভিযোগের টানাপোড়েনের পর, এই প্রথম সরাসরি কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেটের (ইডি) খাতায় আনুষ্ঠানিকভাবে উঠে এল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম।
পর্যটন ও সংস্কৃতি দফতরের প্রাক্তন মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে দীর্ঘ জিজ্ঞাসাবাদের পর ইডি-র প্রকাশ করা একটি বিস্ফোরক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে এই দাবি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সংস্থার দাবি, ইন্দ্রনীল সেনের সংস্থা থেকে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে স্থানান্তরিত করা হয়েছিল প্রায় ৩০ লক্ষ টাকা।
ইডি-র বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, আর্থিক তছরুপ প্রতিরোধ আইনের (PMLA) ১৭ নম্বর ধারা মেনে গত ২৯ সেপ্টেম্বর কলকাতার ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় তল্লাশি অভিযান চালানো হয়েছিল। সেখানে ইন্দ্রনীল সেন ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের বাড়ি এবং অফিস ছিল।
তদন্তে উঠে আসে, ইন্দ্রনীল মন্ত্রী থাকাকালীন তাঁর নিজস্ব সংস্থা ‘অক্টেভ রেকর্ডস’ এবং তাঁর ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে মোট ৩.৮ কোটি টাকা জমা পড়েছিল। সেখান থেকেই পরবর্তীতে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অ্যাকাউন্টে ৩০ লক্ষ টাকা পাঠানো হয়।
ইডি-র জেরায় ইন্দ্রনীল সেন দাবি করেছেন, ওই অর্থ মমতাকে ‘রয়্যালটি’ বাবদ দেওয়া হয়েছিল। যদিও কিসের রয়্যালটি, সে বিষয়ে বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। তবে এর আগে মমতা বারবার দাবি করেছিলেন যে, ছবি এঁকে বা গান লিখে তিনি রয়্যালটি পান।
এই বিষয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে ডেমোক্রেটিক তৃণমূল নেতা মদন মিত্র বলেন, “মমতা ইন্দ্রনীলের থেকে টাকা নিয়েছেন, এটা ভাবাই কঠিন।” অপরদিকে বিজেপির সজল ঘোষের পাল্টা তোপ, “এটা রয়্যালটি নয়, আসলে কাটমানি! এই চক্রের পেছনে যে মমতার হাত ও মাথা দুটোই ছিল, তা আগেই বলেছিলাম।”
তদন্তকারীদের দাবি, ২০২১ সালে কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর হেরিটেজ স্বীকৃতি পাওয়ার পর তৈরি হয় ‘মাস আর্ট’ নামের একটি সংস্থা। ইন্দ্রনীল সেনের স্ত্রী মধুছন্দা সেন ছিলেন যার সভাপতি এবং সায়ন্তন মৈত্র সহ-সভাপতি।
ইউনেস্কো অনুমোদিত ভুয়ো পরিচয় ব্যবহার করে ২০২২ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে কলকাতার নির্বাচিত ২৪টি নামী প্যান্ডেল দেখানোর নামে ১৭৪৯ টাকা থেকে ৫৪৯৯ টাকা মূল্যের ভিআইপি পাস বিক্রি করা হয়।
কেবল ২০২৩ ও ২০২৪ সালেই এক লক্ষেরও বেশি টিকিট বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও দুর্গাপুজোকে লাভজনক ব্যবসায় পরিণত করার অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে জয়দীপ মুখোপাধ্যায় নামক এক ব্যক্তির অভিযোগের ভিত্তিতে বৌবাজার থানায় মামলা রুজু হয়, যার পরেই তদন্তে নামে ইডি।
শুধু পুজো পাস বিক্রিই নয়, মন্ত্রী থাকাকালীন ইন্দ্রনীলের বিরুদ্ধে তাঁর ঘনিষ্ঠ ধ্রুবজ্যোতি বসু ও দীপেশ রায়ের সংস্থাকে সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রকের ৮৫ কোটি টাকারও বেশি সরকারি টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
সেই টাকা ঘুরপথে ইন্দ্রনীলের আত্মীয়দের সংস্থার অ্যাকাউন্টে পাঠানো হয় বলেও তদন্তকারী সংস্থার দাবি। রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ইডি-র খাতায় প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর নাম সরাসরি উঠে আসায় রাজ্য রাজনীতিতে নজিরবিহীন তোলপাড় শুরু হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন