সিউড়ি: একদা যাঁর হুঙ্কারে বীরভূমের বাঘে-গরুতে এক ঘাটে জল খেত, যাঁর দাপটে থরথরি কম্পমান থাকত গোটা জেলা, সেই অনুব্রত মণ্ডল কি তবে রাজনৈতিক ক্ষমতার অলিন্দ থেকে হারিয়ে গিয়ে আজ একেবারেই চুপসে গেলেন?
সিউড়ির পুরনো বাস স্ট্যান্ডের পার্টি অফিসে বুধবার সন্ধ্যায় যে অভাবনীয় ঘটনার সাক্ষী থাকল বীরভূম, তাতে কেবল দলীয় কার্যালয়ের এসি, টেবিল বা চেয়ার গুঁড়ো হয়নি, বরং গুঁড়িয়ে গিয়েছে অনুব্রতের এতদিনের তৈরি করা দোর্দণ্ডপ্রতাপ ভাবমূর্তিও।
বুধবার বিকেলে সিউড়ির গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেসের পার্টি অফিসের দোতলায় আচমকাই গাছের ডাল ও লাঠি হাতে চড়াও হয়েছিল তিন যুবক। তাদের নাম, আকাশ দেবনাথ, বান্টি বীরবংশী এবং ঋষভ গোর। দোতলায় চেয়ারে বসে থাকা অনুব্রতকে সামনে রেখেই শুরু হয় তাণ্ডব। একদা জেলা তৃণমূলের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, তথা বর্তমান ঋতব্রত তৃণমূলের জেলা সভাপতির জামার কলার ধরে চলে বেপরোয়া হুমকি।
এসি, চেয়ার, টেবিলের কাচ ভাঙার প্রচণ্ড শব্দে যখন পুরো ঘর কেঁপে উঠছে, তখন কেষ্টর মুখে ঝুলছিল এক অলৌকিক, স্মিত হাসি! তাণ্ডবকারীদের নানা প্রশ্নের মুখে কখনও তিনি নীরব, আবার কখনও বলে উঠছেন, “আমি তো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে পছন্দই করতাম না, ও আমার নেতা নয়!”
ভিডিয়ো ভাইরাল হতেই শোরগোল পড়ে যায় রাজ্য রাজনীতিতে। আক্রমণকারীরা চেঁচিয়ে বলতে থাকে, “গত ১৫ বছর আমাদের ওপর কত অত্যাচার করেছ! আর একটা কথা নয়...” কেষ্টর গায়ে কাচের টুকরো ছিটকে পড়লেও তিনি শান্ত গলায় যুবকদের বোঝানোর ব্যর্থ চেষ্টা চালান।
স্থানীয় সূত্রে খবর, এলাকায় এই যুবকদের কোনও সরাসরি রাজনৈতিক পরিচয় নেই, তবে তৃণমূল জমানায় চরম লাঞ্ছিত ও ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষের 'প্রতিবাদের মুখ' হয়েই নাকি এই হামলা। ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ রাতারাতি ওই তিন যুবককে আটক করলেও, আশ্চর্যজনকভাবে কিছু ঘণ্টার মধ্যেই তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়। কারণ? আক্রান্ত অনুব্রত মণ্ডল বা তাঁর দলের তরফে থানায় কোনও লিখিত অভিযোগ দায়ের হয়নি! এমনকি রাজ্য পুলিশও কোনও স্বতঃপ্রণোদিত মামলা রুজু করেনি।
আইনশৃঙ্খলার এই অদ্ভুত শিথিলতা এবং অনুব্রতের রহস্যময় নীরবতা নিয়ে এখন তীব্র জল্পনা। প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহলে প্রশ্ন উঠছে, তবে কি কোনও গভীর রাজনৈতিক চাপ বা অলিখিত সমীকরণের বলির পাঁঠা হতে হল একদার চালককে?
নাকি এলাকা হারানোর ভয়ে স্রেফ মুখ বুজে অপমান হজম করলেন অনুব্রত? গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস নেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ঘটনার পিছনে বিজেপির ইন্ধন দেখলেও, নিজ দলেরই বিরোধী গোষ্ঠী অর্থাৎ কাজল শেখ আবার কটাক্ষ করে বলেছেন, "পুরোটাই সাজানো নাটক।"
অন্যদিকে, কুণাল ঘোষ রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তুলে ক্ষোভ উগরে দিয়েছেন। অভিযুক্তদের ছেড়ে দেওয়া এবং বীরভূমের প্রাক্তন 'বাঘ'-এর এমন ভেজা বেড়ালের মতো আত্মসমর্পণ দেখে স্থানীয়দের একাংশের বক্তব্য, ক্ষমতার অহংকার আর ফুটুনি চিরকাল থাকে না। কিন্তু প্রশ্ন একটাই, মার খেয়েও আইনি লড়াইয়ে না গিয়ে যে নীরবতা অনুব্রত বেছে নিলেন, তা কি তাঁর রাজনৈতিক কেরিয়ারের চূড়ান্ত পতনেরই ইঙ্গিত? উত্তর খুঁজছে বীরভূম।

বৃহস্পতিবার, ০১ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০১ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন