সিউড়ি: দীর্ঘ ১৭ বছরের দীর্ঘশ্বাসের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে স্বভূমে ফিরল বীরভূমের নানুরের পাপুড়ি গ্রামের প্রায় ৪০টি ঘরছাড়া পরিবার। কলকাতা হাই কোর্টের বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের ঐতিহাসিক নির্দেশে ও পুলিশের কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনীতে সোমবার নিজেদের ভিটেমাটিতে পা রাখেন এই বাস্তুচ্যুত মানুষগুলি। এতদিন পর গ্রামের মাটিতে পা দিয়ে এবং পুরনো প্রতিবেশীদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন অনেকেই। তবে এই আবেগঘন প্রত্যাবর্তনের সঙ্গেই তীব্র হয়ে উঠেছে নানুরের রাজনৈতিক উত্তাপ। গৃহহারাদের অভিযোগ ছিল শাসকদলের প্রভাবশালী নেতা তথা গণতান্ত্রিক তৃণমূলের বিধায়ক কাজল শেখের অনুগামীদের দিকে। যদিও নিজের বিরুদ্ধে সমস্ত অভিযোগ এক ফুঁয়ে উড়িয়ে দিয়ে কাজল শেখের পালটা তোপ, যাঁদের আদালতে নির্দেশে ফেরানো হলো, তাঁরা আসলে সিপিএমের দাগি ‘হার্মাদ’ এবং একাধিক খুনের মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি।
আদালত ও স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০০৯ সালে নানুরে বাম-তৃণমূলের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের চরম পর্যায়ে প্রাণভয়ে গ্রাম ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল এই ৪০টি পরিবার। অভিযোগ, ২০১১ এবং ২০১৬ সালে আইনি সহায়তায় সাময়িকভাবে গ্রামে ফিরলেও তাঁদের পানীয় জল বন্ধ করা, সামাজিক বয়কট এবং দোকানে কেনাকাটায় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বারবার তাড়িয়ে দেওয়া হয়। এমনকি ২০২১ সালের নির্বাচন-পরবর্তী হিংসায় জেসিবি এনে পাকা বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর অভিযোগও উঠেছিল। শেষমেশ বিচার ব্যবস্থার দরজায় ধাক্কা দিয়ে হাই কোর্টের নির্দেশে দীর্ঘ ১৭ বছর পর গ্রামে ফেরার ছাড়পত্র পান তাঁরা।
তবে এই প্রত্যাবর্তনকে সহজভাবে নিতে নারাজ কাজল শেখ। হাই কোর্টের রায়কে সম্মান জানালেও কাজল সুর চড়িয়ে বলেন, “আদালতের নির্দেশে পুলিশ ওদের এনেছে, আমরা আগে জানতাম না। কিন্তু ইতিহাস ভোলা সম্ভব নয়। ২০০৯ সালে সিরাজ শেখ এবং আমার বাবা ও দুই দাদাকে নৃশংসভাবে খুন করার পেছনে এই লোকগুলির সরাসরি হাত ছিল। সদু শেখ ও লতু শেখ হত্যাকাধেও এরা অভিযুক্ত। খুনজখম করার পর পুলিশের ভয়ে নিজেরাই গ্রাম ছেড়ে পালিয়েছিল।”
গ্রামের মানুষ এদের কোনো দিন মেনে নেবে না দাবি করে কাজল বিধায়ক হিসেবে প্রশাসনের কাছে আবেদন জানান, গ্রামে ফেরা ব্যক্তিদের পুরোনো অপরাধমূলক ট্র্যাক রেকর্ড যেন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখা হয়। ১৭ বছর পর হাই কোর্টের হস্তক্ষেপে ভিটেমাটি ফেরত পেলেও রাজনৈতিক উত্তেজনা ও পুরোনো বৈরিতার কারণে নানুরের পাপুড়ি গ্রামের বাতাস এখন বারুদস্তূপের মতো থমথমে।

সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন