কাঠমান্ডু: নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোটেকোশী নদীর প্রলয়ঙ্কর হড়পা বানের ভয়াবহ রূপের নেপথ্যে একের পর এক বিস্ফোরক বৈজ্ঞানিক তথ্য উঠে আসছে। ভূবিজ্ঞানীদের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বুধবার সকালে ভূমিকম্প ও ব্যাপক তুষারধসের জেরেই এই ধ্বংসলীলার সূত্রপাত। তুষারধসের ফলে ভারী পাথর ও বরফের স্তূপ পড়ে লেহন্দে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পুরোপুরি রুদ্ধ হয়ে যায়। পরবর্তীতে সেই কৃত্রিম বাধার পেছনে বিপুল পরিমাণ জল জমে প্রবল চাপ তৈরি হয় এবং মুহূর্তের মধ্যে সেই অবরোধ ভেঙে সর্বগ্রাসী রূপ নিয়ে জলস্রোত আছড়ে পড়ে ভোটেকোশী নদীতে। পাশাপাশি হিমবাহের বরফগলা জলে পুষ্ট কোনও হ্রদ ফেটে যাওয়ার ফলেও এই তাণ্ডব বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।নেপালের বিদেশমন্ত্রী শিশির খনাল পার্লামেন্টে জানিয়েছেন, সকাল ৮টা ৩৭ মিনিট নাগাদ তিব্বত ভূখণ্ডে ৪.৪ মাত্রার একটি কম্পন আঘাত হানে, যার কিছুক্ষণের মধ্যেই অর্থাৎ ৮টা ৪০ মিনিটে ভোটেকোশীতে হড়পা বান নামতে শুরু করে। কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূবিজ্ঞানের অধ্যাপক রিজন ভক্ত কায়স্থ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চিন-অধিকৃত তিব্বতের দিক থেকে আসা ভূমিকম্প ও নেপালের সীমান্ত এলাকায় নেমে আসা তুষারধসের যুগপৎ প্রভাবেই এই প্রাকৃতিক বিপর্যয় তীব্র আকার ধারণ করে। এই আকস্মিক দুর্যোগের জেরে কৈলাস-মানস সরোবর যাত্রার উদ্দেশ্যে রওনা হওয়া ১৪১ জন ভারতীয় নাগরিক সহ অন্তত ৩৮৪ জন দেশি-বিদেশি পর্যটক নিখোঁজ হয়ে পড়েছেন এবং পার্শ্ববর্তী নুয়াকোট ও ধারিং জেলাও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই ভয়াবহ পরিণতির স্পষ্ট সঙ্কেত ২০১৯ সালেই 'সায়েন্স অ্যাডভান্সেস' পত্রিকায় প্রকাশিত একটি আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেওয়া হয়েছিল। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী জোশুয়া মরারের নেতৃত্বাধীন সেই গবেষণাপত্রে জানানো হয়েছিল, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ে বরফ গলার গতি ২০০০ সালের পর থেকে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গিয়েছে এবং গত চার দশকে হিমবাহগুলির এক-চতুর্থাংশ অংশই গলে গিয়েছে। হিমালয় পার্বত্য অঞ্চলে অপরিকল্পিত নির্মাণ, বনভূমি ধ্বংস ও সুড়ঙ্গ তৈরির লাগামছাড়া কাজের ফলেই হিমবাহের হ্রদ ফেটে এমন ভয়াবহ হড়পা বানের পুনরাবৃত্তি ঘটছে, যা ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর ফের এক মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনল।