Mamata Banerjee: চার দশকে এই প্রথম মমতাহীন বঙ্গভোট! নন্দীগ্রামের পর রেজিনগরেও প্রার্থী প্রত্যাহার
কলকাতা ও বহরমপুর: বঙ্গ রাজনীতির প্রায় চার দশকের ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও অভাবনীয় মোড়। নন্দীগ্রামের পর এবার মুর্শিদাবাদের রেজিনগর— উপনির্বাচনের ময়দান থেকে পুরোপুরি অদৃশ্য হয়ে গেল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নাম ও উপস্থিতি। নন্দীগ্রামে কালীঘাট শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে’র মনোনয়ন প্রত্যাহারের পথেই শনিবার সকালে হাঁটলেন রেজিনগরের মমতা তৃণমূলের প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। ফলে আগামী ৬ অক্টোবরের বিধানসভা উপনির্বাচনে রাজ্যের দু’টি কেন্দ্রের একটিতেও থাকছে না মমতা সমর্থিত কোনও প্রার্থী। নির্বাচন কমিশনের কাছে নাম ও প্রতীক হাতছাড়া হওয়ার পর প্রার্থীদের এই পিছিয়ে আসাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে তীব্র চাঞ্চল্য।পুরো ঘটনাক্রমের সূত্রপাত নির্বাচন কমিশনের এক নজিরবিহীন সিদ্ধান্তে। তৃণমূলের অন্দরে কালীঘাটপন্থীদের পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন বিক্ষুব্ধ শিবিরের কোন্দল চরম আকার ধারণ করায় কমিশন 'জোড়াফুল' প্রতীক এবং 'তৃণমূল কংগ্রেস' নামটি ফ্রিজ করে দেয়। জোড়াতালি দিতে কালীঘাটপন্থীদের নতুন নাম দেওয়া হয় ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং প্রতীক দেওয়া হয় ‘ফুটবলার’। অন্যদিকে ঋতব্রত শিবির পায় ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ ও খাম প্রতীক। নতুন নামের সেই 'মমতা তৃণমূল'-এর প্রার্থীরাই একের পর এক ভোটের ময়দান থেকে সরতে শুরু করায় এখন দিশাহীন পরিস্থিতি কালীঘাটে।শনিবার ছিল মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন। সকালে বহরমপুরের প্রশাসনিক ভবনে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজের প্রার্থীপদ তুলে নেন রেজিনগরের তৃণমূল প্রার্থী রবিউল আলম চৌধুরী। সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে তিনি স্পষ্ট জানান, “নতুন প্রতীক ‘ফুটবলার’ এত কম সময়ে সাধারণ মানুষ ও কর্মীদের চেনানো প্রায় অসম্ভব। তা ছাড়া কর্মীদের ওপর পুলিশ ও বিরোধীদের ব্যাপক চাপ তৈরি করা হচ্ছে, অনেককে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। কর্মীদের মাঠে নামানোই যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে ভোট করা সম্ভব নয় বলেই আমি নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সঙ্গে কথা বলে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”এর আগে শুক্রবার নাটকীয়ভাবে নন্দীগ্রামের মমতা তৃণমূলের প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করেছিলেন। শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে গোপনে দেখা করার পরই সঞ্চিতার এই পদক্ষেপে তীব্র শোরগোল পড়ে। সেই ধাক্কা সামলাতে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঘোষণা করেন, নন্দীগ্রামে তাঁরা ‘সিস্টার পার্টি’ কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করবেন। কিন্তু সেই ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ১৯ বছরের পুরোনো খুনের মামলায় চণ্ডীপুর থেকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে মিলন প্রধানকে। এক দিকে নন্দীগ্রামে প্রার্থী তুলে নিয়ে কংগ্রেসকে সমর্থন এবং তার পরেই সেই প্রার্থীর গ্রেপ্তারী, আর অন্য দিকে রেজিনগরে রবিউলের সরে দাঁড়ানো— জোড়া ধাক্কায় রাজ্য রাজনীতিতে মমতা শিবিরের কৌশলগত অবস্থান এখন সম্পূর্ণ ব্যাকফুটে।এই নজিরবিহীন পরিস্থিতি নিয়ে কালীঘাট শিবিরকে খোঁচা দিতে ছাড়েনি বিরোধী বিক্ষুব্ধ শিবির। শ্রীরামপুরের সাংসদ তথা ঋতব্রত শিবিরের অন্যতম মুখ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য ড্যামেজ কন্ট্রোলের চেষ্টা চালিয়ে বলেছেন, “কিছু সমস্যা তো অবশ্যই তৈরি হয়েছে, তবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ছাড়া তৃণমূলের কোনও আসল অস্তিত্বই নেই। আমরা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলছি।” অন্যদিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় কটাক্ষ ছুড়ে দিয়ে বলেন, “কদিন আগে ১০ পাশ এক নেতা দাবি করেছিলেন নন্দীগ্রামে প্রার্থীরা নাকি অঘটন ঘটাবেন! গতকাল নন্দীগ্রামে আর আজ রেজিনগরে তাঁদের প্রার্থীরা সত্যিই অঘটন ঘটালেন। আসলে নেত্রী গোল দেওয়ার উদ্দেশ্যে ময়দানে নেমেছিলেন, কিন্তু তাঁর সমস্ত শট এখন নিজেদের গোলেই ঢুকে সেমসাইড হয়ে যাচ্ছে!”নির্বাচন কমিশনের প্রতীক ফ্রিজ করার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে আগামী ৬ অক্টোবরের উপনির্বাচনে যে বঙ্গ রাজনীতির ২৯ বছর তথা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের একক রাজনৈতিক জীবনের প্রায় চার দশকের ইতিহাসে প্রথম বার তাঁর কোনও নিজস্ব প্রতিনিধি ছাড়াই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে চলেছে, তা এখন বাস্তবতা। ৯ অক্টোবরের ভোটগণনা তাই কোন দিকে মোড় নেয়, সেদিকেই চোখ গোটা দেশের।