নয়াদিল্লি ও কলকাতা: দীর্ঘ দু’বছরের জেলবাসের পর অবশেষে সুপ্রিম কোর্ট থেকে জামিন পেলেন আর জি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের প্রাক্তন অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষ। দুর্গাপুজোর আবহেই শীর্ষ আদালতের এই রায়ে সন্দীপবাবু স্বস্তি পেলেও, চরম ক্ষোভ ও হতাশায় ফুঁসছে আন্দোলনকারী চিকিৎসকদের সংগঠন ‘জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট’। সিবিআইয়ের তদন্তের শ্লথ গতি এবং রাজ্য ও কেন্দ্রের রাজনৈতিক অভিসন্ধির কারণেই অভিযুক্তের জামিনের পথ সুগম হল বলে তোপ দেগেছেন আন্দোলনকারীরা।
আর জি করের তরুণী গবেষকের নৃশংস ধর্ষণ ও খুনের পর প্রকাশ্যে আসে হাসপাতালের বিপুল আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ। জালিয়াতি ও তথ্যপ্রমাণ লোপাটের অভিযোগে ২০২৪ সালের আগস্টে তাঁকে গ্রেফতার করেছিল সিবিআই। সম্প্রতি কলকাতা হাইকোর্টের বিচারপতি তীর্থঙ্কর ঘোষের একক বেঞ্চ সন্দীপ ঘোষের জামিনের আবেদন খারিজ করে দিয়েছিল। হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ ছিল, এই দুর্নীতি সরাসরি সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্য পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত এবং অভিযুক্ত অতীব প্রভাবশালী হওয়ায় সাক্ষীদের প্রভাবিত করতে পারেন।
হাইকোর্টের সেই রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন সন্দীপ ঘোষের আইনজীবীরা। শুক্রবার শীর্ষ আদালতের বিচারপতি এম এম সুন্দরেশ এবং বিচারপতি প্রসন্ন বি ভারালের ডিভিশন বেঞ্চ হাইকোর্টের নির্দেশ বাতিল করে প্রাক্তন অধ্যক্ষের জামিন মঞ্জুর করে।
ডিভিশন বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, দু’বছরেরও বেশি সময় ধরে জেলবন্দি সন্দীপ ঘোষ। অথচ ১৪৭ জন সাক্ষীর মধ্যে এ যাবৎ মাত্র সাতজনের সাক্ষ্যগ্রহণ সম্পন্ন করেছে সিবিআই। বিচারপ্রক্রিয়ার এই ধীর গতির যুক্তিকেই জামিনের প্রধান ভিত্তি হিসেবে তুলে ধরে শীর্ষ আদালত। ষষ্ঠীর মুখেই সমস্ত আইনি প্রক্রিয়া শেষ হলে পুজোর মধ্যেই জেলমুক্ত হতে পারেন আর জি করের প্রাক্তন প্রধান।
তবে আদালতের এই রায়ে ন্যায়বিচারের স্থান নিয়ে বড়সড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছেন প্রতিবাদী চিকিৎসকেরা। আন্দোলনের অন্যতম প্রধান মুখ অনিকেত মাহাতো সিবিআইয়ের নিরপেক্ষতা ও সদিচ্ছা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন তুলে কটাক্ষের সুরে বলেন, "কী ভাবে ন্যায়বিচারকে প্রহসনে পরিণত করতে হয়, তা সিবিআইয়ের থেকে শেখা উচিত।" গত দুই বছরে ১৪৭ জনের মধ্যে মাত্র সাতজনকে জেরা করার এই চরম দীর্ঘসূত্রিতাই সন্দীপ ঘোষের জামিনের পথ প্রশস্ত করেছে বলে অভিযোগ তাঁর।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্ষোভ উগরে দিয়েছে ‘জুনিয়র ডক্টরস ফ্রন্ট’-ও। তাদের বক্তব্য, চিকিৎসকের মর্মান্তিক মৃত্যুকে কেবল রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি ও ক্ষমতা দখলের হাতিয়ার করা হয়েছে। ডবল ইঞ্জিন সরকারের রাজনৈতিক অভিসন্ধি আজ আমজনতার কাছে নগ্ন। প্রশ্ন তোলা হয়েছে, অভিযুক্ত হেফাজতে থাকা সত্ত্বেও নির্দিষ্ট সময়ে কেন সাপ্লিমেন্টারি চার্জশিট জমা দিতে পারল না তদন্তকারী সংস্থা? এই ব্যর্থতার দায় কার?
স্বাস্থ্য দুর্নীতির মূলে আঘাত করার দাবিতে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, সন্দীপ ঘোষের এই জামিন সেখানে বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন আন্দোলনকারীরা। পুজো শুরুর আনন্দমুখর সময়ে শীর্ষ আদালতের এই রায়ে শহরজুড়ে বিচার পাওয়ার দীর্ঘ লড়াই নিয়ে আবারও বিতর্কের ঝড় উঠেছে।

শনিবার, ১৭ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন