মেদিনীপুর: শালবনি জমি দুর্নীতি মামলায় তদন্তের জল গড়িয়েছে অনেক দূর। তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের প্রাক্তন আপ্তসহায়ক (PA) সুমিত রায়ের বিরুদ্ধে মেদিনীপুর আদালতে জমা পড়া সিআইডি-র (CID) সাম্প্রতিক চার্জশিটে উঠে এল এক চাঞ্চল্যকর ও বিস্ফোরক দাবি।
শালবনিতে সরকারি বাস্তুচ্যুত উদ্বাস্তুদের জন্য বরাদ্দ জমি বেআইনিভাবে দখল করে বিক্রি করার যে র্যা কেট তৈরি হয়েছিল, তার অন্যতম মূল নিয়ন্ত্রক ছিলেন খোদ সুমিত রায়ই, এমনটাই দাবি রাজ্য গোয়েন্দা সংস্থার। চার্জশিটে এই অভিযোগ প্রমাণের মূল হাতিয়ার করা হয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই প্রাক্তন ব্যক্তিগত দেহরক্ষী (PSO) এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের দেওয়া চাঞ্চল্যকর গোপন জবানবন্দিকে।
অভিষেকের দেহরক্ষীদের বিস্ফোরক সাক্ষ্য ও কোটি টাকার লেনদেন
গত ২ সেপ্টেম্বর শালবনি মামলায় প্রথম চার্জশিট পেশ করেছিল সিআইডি। সম্প্রতি আদালতে পেশ করা মূল চার্জশিটে সিআইডি জানিয়েছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সরকারি উদ্বাস্তুদের জমি ভুয়ো দলিলে বিক্রির কারবার চালাতেন প্রাক্তন বিধায়ক সুজয় হাজরা, অনিতেশ পাইরা এবং তাঁদের চক্র। চার্জশিটের মোট ২০ জন সাক্ষীর মধ্যে রয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ী, সুজয়ের গাড়িচালক এবং সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণভাবে অভিষেকের আলিপুরদুয়ার ও নদিয়ার বাসিন্দা দুই প্রাক্তন দেহরক্ষী।
সাক্ষীদের বয়ান অনুযায়ী, শালবনিতে জালিয়াতি করা জমির টাকার একটা বড় অংশ সরাসরি সুমিতের অফিসে পৌঁছে দিতেন সুজয় হাজরা। এমনকি চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত দুই স্থানীয় ব্যবসায়ী স্পষ্ট জানিয়েছেন, তাঁরা নিজেদের চোখে সুজয়কে সুমিতের হাতে বিপুল টাকার বান্ডিল তুলে দিতে দেখেছেন। সুমিতের প্রবল রাজনৈতিক দাপট ও প্রতিপত্তির ভয়ে এতদিন কেউ মুখ খোলার সাহস পাননি। সিআইডি আরও উল্লেখ করেছে, ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে সুমিতের একটি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে প্রায় সাত কোটি টাকা জমা পড়েছিল, যার কোনো বৈধ উৎস তিনি দেখাতেন পারেননি।
ভুয়ো বিক্রেতা ও বলপূর্বক জমি দখল
সিআইডির তদন্তে প্রকাশ, যে জমিগুলি হাতবদল করা হয়েছে সেগুলির দলিলের ‘বিক্রেতা’রা সম্পূর্ণ ভুয়ো ও কাল্পনিক। নির্দিষ্ট ঠিকানায় গিয়ে সেই নামের কোনো ব্যক্তির অস্তিত্ব মেলেনি। ২০২১ সালের পর থেকে দীর্ঘদিন ধরে চাষাবাদ করে আসা আসল উদ্বাস্তুদের সেখান থেকে জোড়জুলুম করে তাড়িয়ে দেওয়া হয়। সুজয় হাজরার দুই দালাল দেবাশিস দে এবং সুব্রত হাজরাও সিআইডি-র কাছে সুমিত রায়কে সরাসরি টাকা পাঠানোর কথা স্বীকার করেছেন।
সুপ্রিম কোর্টের রক্ষাকবচ খারিজ ও মেদিনীপুর আদালতে পেশ
গত বৃহস্পতিবার সুপ্রিম কোর্ট থেকে সুমিত রায়ের আইনি রক্ষাকবচ বা অন্তর্বর্তী সুরক্ষার মেয়াদ উঠে যায়। গোয়েন্দাদের প্রশ্নের মুখে বারবার আর্থিক লেনদেনের সদুত্তর এড়িয়ে যাওয়ায় শীর্ষ আদালত এই নির্দেশ দেয়। এর পরই অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে অভিষেকের কালীঘাটের বাসভবন সংলগ্ন এলাকা থেকে সুমিত রায়কে গ্রেফতার করে সিআইডি।
ভবানীভবনে ম্যারাথন জিজ্ঞাসাবাদের পর শুক্রবার সুমিতকে কড়া পুলিশি নিরাপত্তায় মেদিনীপুর জেলা আদালতে তোলা হলে বিচারক তাঁর ৮ দিনের সিআইডি হেফাজত মঞ্জুর করেন। গোয়েন্দা সূত্রে দাবি, সিআইডি হেফাজতে প্রাথমিক জেরায় নিজের অপরাধের কথা আংশিক স্বীকার করেছেন সুমিত এবং এই আর্থিক দুর্নীতির নেপথ্যে আরও একাধিক প্রভাবশালী ও হেভিওয়েট নাম জড়িত রয়েছে বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন। সেই আত্মসাৎ করা কোটি কোটি টাকা উদ্ধারে তদন্তকারীদের সহযোগিতার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি। সব মিলিয়ে, সিআইডির এই চার্জশিট প্রকাশে রাজ্য রাজনীতিতে চরম তোলপাড় শুরু হয়েছে।
হিডেন স্টোরিজ নিউজ

রোববার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন