কলকাতা: দীর্ঘ আইনি জটিলতা কাটিয়ে পুজোর মুখে অবশেষে স্বস্তি পেল বামেরা।
বনগাঁয় যশোর রোডের ধারে সিপিএমের ঐতিহ্যবাহী বুক স্টল তৈরির ওপর সমস্ত নিষেধাজ্ঞা খারিজ করে দিল কলকাতা হাই কোর্ট। বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, অন্য দল বা ব্যক্তিরা যেখানে মর্জিমতো স্টল বা অস্থায়ী নির্মাণ করার অনুমতি পাচ্ছেন, সেখানে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে সিপিএমকে বঞ্চিত করা যাবে না। আইন সকলের জন্য সমান। তবে শান্তি ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে বেশ কিছু কঠোর শর্ত বেঁধে দিয়েছে আদালত।
গত ৬৩ বছর ধরে বনগাঁয় পুজোর দিনগুলিতে এই বুক স্টল বসানোর ঐতিহ্য চলে আসছে। কিন্তু এ বার অনুমতি নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে টানাপোড়েন শুরু হয়। মামলা গড়ায় কলকাতা হাই কোর্টে। বৃহস্পতিবার বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের বেঞ্চে এই মামলার দীর্ঘ ও তরজা-পূর্ণ শুনানি হয়।
শুনানি পর্বে রাজ্যের অ্যাডভোকেট জেনারেল (এজি) সুরজিৎ নাথ মিত্র ও অতিরিক্ত এজি বিল্বদল ভট্টাচার্য দাবি করেন, হাইওয়ের ওপর বা অন্যের জমিতে এভাবে হঠাৎ করে অনুমতি ছাড়াই কোনও অস্থায়ী নির্মাণ করা যায় না।
এজির যুক্তি ছিল, পিডব্লিউডি (PWD)-র অনুমতি ছাড়া কিংবা জমির মালিকের সম্মতি ছাড়া পুলিশ প্রশাসন কোনো নির্মাণ বা রাজনৈতিক স্টলের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা দিতে বাধ্য নয়। এমনকি স্থানীয় এক বাড়ির মালিক হিন্দু জাগরণ মঞ্চকে ওই জায়গায় স্টল বানানোর অনুমতি দিয়েছেন বলেও দাবি করা হয়।
যদিও এই যুক্তির তীব্র সমালোচনা করেন বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্য। তাঁর স্পষ্ট পর্যবেক্ষণ, "বাকিরা নিজেদের মর্জিমতো স্টল তৈরি করেছে, তারা তো কোনো অনুমতি নেয়নি! অথচ সিপিএমকে আলাদা করে অনুমতি নিতে হবে কেন? একেক জনের ক্ষেত্রে একেক রকম নিয়ম থাকতে পারে না। কেউ স্টল করতে চাইল আর কেউ এসে বাধা দিল, এতে তো রাজ্যে অস্থিরতা তৈরি হবে।"
আদালত এও হুঁশিয়ারি দিয়ে বলে যে, রাজ্য যদি বেআইনি নির্মাণের কথা বলে, তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সমস্ত অস্থায়ী নির্মাণ বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হোক। অন্যথায় অন্যদের যেখানে স্টল করার ছাড়পত্র মিলেছে, সেখানে আবেদনকারীদের বই বিক্রির অনুমতি দিতে বাধা কোথায়? সিপিএমের পক্ষে সওয়াল করতে গিয়ে বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশরঞ্জন ভট্টাচার্য জানান, এটা কোনও জমি সংক্রান্ত বিবাদ নয়, বরং বিরোধী রাজনৈতিক দলের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার লড়াই।
সব পক্ষের সওয়াল শোনার পর বুক স্টল তৈরির অনুমতি দিলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার্থে কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে আদালত:
নিরাপত্তা ও দূরত্ব: নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পার্টি অফিসের ১০০ মিটারের মধ্যে এই বুক স্টল তৈরি করতে হবে।
পুলিশ মোতায়েন: স্টল তৈরির সময় এবং পুজোর বাকি দিনগুলিতে এলাকায় যাতে কোনো ধরনের অশান্তি না ছড়ায়, তা নিশ্চিত করতে পর্যাপ্ত পুলিশ বাহিনী মোতায়েন রাখতে হবে।
রিপোর্ট তলব: পুরো প্রক্রিয়া ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর নজর রেখে জেলা পুলিশ সুপারকে আগামী ২৩ নভেম্বরের মধ্যে হাই কোর্টে রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
পঞ্চমীর দিন আদালতের এই রায়ে একদিকে যেমন বামশিবিরে উৎসবের আমেজ ফিরেছে, তেমনই প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আইনি বিতর্কও তৈরি হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৫ অক্টোবর ২০২৬

আপনার মতামত লিখুন