চিরশত্রুর কান্নায় গলেছিল পর্তুগিজ যুবরাজের কঠিন হৃদয়
রিয়াধ : ২০০৮ থেকে শুরু হওয়া সেই ঐতিহাসিক দ্বৈরথ ফুটবল বিশ্বকে দুটি আলাদা শিবিরে ভাগ করে দিয়েছিল। একজন বাঁ পায়ের জাদুতে ক্যানভাস আঁকতেন, অন্যজন ডান পায়ের শটে প্রতিপক্ষের ডিফেন্স দুমড়ে-মুচড়ে দিতেন। লিওনেল মেসি এবং ক্রিস্টিয়ানো রোনাল্ডো। ফুটবলের ইতিহাসের দুই সেরা মহীরূহ। কিন্তু মাঠের সেই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আড়ালে যে এক গভীর শ্রদ্ধা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার স্রোত বইছিল, তা ২০১৬ সালে বিশ্ববাসী হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছিল। শতবর্ষের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির কাছে টাইব্রেকারে হেরে যখন চোখের জলে জাতীয় দলকে বিদায় জানিয়েছিলেন ২৯ বছরের মেসি, তখন সেই তীব্র বেদনার মুহূর্তে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন আর কেউ নন, স্বয়ং রোনাল্ডো।২০২৬ সালে এসে মেসি হয়তো চিরতরে আর্জেন্টিনার নীল-সাদা জার্সিকে ‘আলবিদা’ জানিয়েছেন। বিশ্বকাপের ফাইনালে স্পেনের কাছে হেরে মেসির এই চূড়ান্ত বিদায়ে আজ বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে ফের উঠে আসছে দশ বছর আগের সেই স্মৃতি। কিন্তু ২০১৬ সালের সেই প্রথম অবসর ঘোষণার পর রোনাল্ডোর প্রতিক্রিয়া শুধু একটা মন্তব্য ছিল না; তা ছিল দুই সর্বকালের সেরার আত্মিক সম্পর্কের এক অনন্য দলিল।"হারতে শেখেনি মেসি, মানুষ যেন ওকে বোঝে"২০১৬ সালের সেই অভিশপ্ত রাতে নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে পেনাল্টি শুটআউটে শট মিস করেছিলেন মেসি। পর পর তিনটি বড় টুর্নামেন্টের ফাইনালে (২০১৪ বিশ্বকাপ, ২০১৫ কোপা আমেরিকা এবং ২০১৬ কোপা আমেরিকা) হার সহ্য করতে না পেরে ক্ষোভে, দুঃখে ও হতাশায় আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানিয়ে দেন এলএমটেন। সারা বিশ্ব যখন মেসির এই আকস্মিক সিদ্ধান্তে স্তব্ধ, তখন স্পেন থেকে স্প্যানিশ সংবাদমাধ্যম ‘মুন্দো দেপোর্তিভো’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মুখ খুলেছিলেন তৎকালীন রিয়াল মাদ্রিদ মহাতারকা রোনাল্ডো।রোনাল্ডোর বার্তার প্রতিটি শব্দে ঝরে পড়েছিল সহমর্মিতা। তিনি বলেছিলেন, "মেসি ভীষণ কঠিন একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সাধারণ মানুষের উচিত ওর পরিস্থিতি এবং আবেগটা বোঝার চেষ্টা করা। কারণ মেসি কখনো হেরে যাওয়া বা দ্বিতীয় হয়ে মাঠ ছাড়ায় অভ্যস্ত নয়।"সাধারণত মাঠের ভেতরে রোনাল্ডোকে অত্যন্ত আক্রমণাত্মক এবং নিজের জয় নিয়ে একরোখা হিসেবেই দেখে এসেছে ফুটবল দুনিয়া। কিন্তু মেসির মতো একজন চ্যাম্পিয়নের মানসিক যন্ত্রণা তিনি মুহূর্তের মধ্যে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। এক ফোঁটা পেনাল্টি শট মিস করে একজন ফুটবলারকে যে বিচার করা যায় না, সেটাও স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন পর্তুগিজ অধিনায়ক। রোনাল্ডো যোগ করেছিলেন, "একটা পেনাল্টি মিস করলেই কেউ খারাপ ফুটবলার হয়ে যায় না। ও যেভাবে ফুটবলকে ভালোবেসেছে, তাতে এই একটা হারের দায় ওর ওপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায়।""মেসির কান্না দেখা কষ্টের, আর্জেন্টিনা ওকে ফের ফেরত পাক"চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর চোখে জল দেখে সেদিন সত্যিই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন সিআর সেভেন। পুরো ফুটবল বিশ্বকে চমকে দিয়ে রোনাল্ডো প্রকাশ্যেই আশা প্রকাশ করেছিলেন যেন মেসি নিজের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করেন এবং দেশের জার্সিতে আবারও মাঠে নামেন।রোনাল্ডো স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, "মেসিকে কাঁদে দেখতে আমার কষ্ট হয়। আমি মনেপ্রানে আশা করি, ও যেন দ্রুত আবার জাতীয় দলে ফিরে আসে। কারণ আর্জেন্টিনার মেসিকে প্রয়োজন, আর ফুটবলের প্রয়োজনে মেসির মাঠে থাকাটা জরুরি।"রোনাল্ডোর সেই প্রার্থনা বা আহ্বান হয়তো ফুটবল ঈশ্বরও শুনেছিলেন। ২০১৬ সালের সেই সাময়িক অবসরের সিদ্ধান্ত ভেঙে মেসি শুধু আর্জেন্টিনায় ফিরেই আসেননি, তার পরের ইতিহাস তো রূপকথার চেয়েও রঙিন। ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয়, ২০২৪ সালে ফের কোপা চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং সর্বোপরি ২০২২ সালে কাতারের মাটিতে অধরা ফিফা বিশ্বকাপ ট্রফিটি নিজের মাথায় তুলে নেওয়া—মেসির এই দ্বিতীয় ইনিংসই তাঁকে ফুটবলের ‘সর্বকালের সেরা’র আসনে চিরস্থায়ী করে দেয়।দশ বছর পর: রোমান্স ও বাস্তবতার শেষ অধ্যায়আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে ইতিহাস যেন নতুন করে নিজের বৃত্ত সম্পূর্ণ করল। দশ বছর আগে রোনাল্ডোর সেই আশাবাদ সত্যি করে মেসি ফুটবলকে যা যা দিয়েছেন, তা রূপকথাকেও হার মানায়। কিন্তু কাকতালীয়ভাবে, মেসির অর্জনের সেই তালিকায় এমন একটি ট্রফি যুক্ত হয়েছে, যা আজও রোনাল্ডোর ট্রফি ক্যাবিনেটে অধরা—ফিফা বিশ্বকাপ।আজ মেসি যখন সত্যিই বুটজোড়া তুলে রাখছেন, তখন রোনাল্ডো নিজেও তাঁর কেরিয়ারের অন্তিম লগ্নে। কিন্তু ২০১৬ সালের সেই কথাগুলো আজ প্রমাণ করে, মাঠের লড়াইয়ে যতই পয়েন্ট বা ব্যালন ডি'অরের হিসাব থাকুক না কেন, মেসির প্রতি রোনাল্ডোর মনোভাব কেবল এক প্রতিযোগীর ছিল না—তা ছিল এক দূরদর্শী সহযোদ্ধার। মেসির প্রথম বিদায়ের দিনে রোনাল্ডোর সেই উক্তিগুলো ফুটবল ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে, যা বারবার মনে করিয়ে দেবে—সেরার দুঃখ কেবল আরেকজন পদ্বপদবীর সেরাই সবচেয়ে ভালো অনুধাবন করতে পারে।হিডেন স্টোরিস নিউজ