বংশপরম্পরার নিয়মে কোপ! পুরীর রথ নির্মাণ মাঝপথেই থামিয়ে দিলেন ক্ষুব্ধ মিস্ত্রিরা, হঠাৎ কেন উঠল প্রতিবাদের ঝড়?
পুরী: মহাপ্রভু জগন্নাথদেবের বিশ্ববিখ্যাত রথযাত্রার কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তার আগেই এবার এক বেনজির বিতর্কের জেরে সাময়িকভাবে থমকে গেল পুরীর ঐতিহ্যবাহী রথ নির্মাণের কাজ। বুধবার প্রায় চার ঘণ্টার জন্য স্তব্ধ হয়ে যায় তিন রথের চাকা তৈরির প্রক্রিয়া। রথ তৈরিতে ব্যবহৃত অবশিষ্ট বা ছাঁট কাঠ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ওপর শ্রী জগন্নাথ মন্দির প্রশাসনের (SJTA) আকস্মিক নিষেধাজ্ঞার জেরেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন বংশানুক্রমিক কারিগররা। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা নিয়মে এভাবে কোপ পড়ায় কাজ বন্ধ রেখে বিক্ষোভে সামিল হন তাঁরা, যা ঘিরে তীব্র শোরগোল পড়ে গিয়েছে মন্দির চত্বরে।[TECHTARANGA-POST:10048]পবিত্র অক্ষয় তৃতীয়ার পুণ্য তিথি থেকে শুরু করে টানা ৫৮ দিন ধরে দিন-রাত এক করে রথ নির্মাণের কাজ চালাচ্ছেন মহারানা সেবক সম্প্রদায়ের ঐতিহ্যবাহী সূত্রধর বা কাঠমিস্ত্রিরা। তাঁদের দাবি, মন্দিরের নিজস্ব অধিকার সংক্রান্ত প্রাচীন নথি অনুযায়ী, রথ তৈরির পর বেঁচে যাওয়া কাঠের ছোট ছোট টুকরোগুলি নিজেদের কাছে রাখার সম্পূর্ণ অধিকার তাঁদের রয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি মন্দির প্রশাসনের তরফে একটি নয়া নির্দেশিকা জারি করে ওই ছাঁট কাঠ বাড়ি নিয়ে যাওয়ার ওপর সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়। আর এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধেই গর্জে ওঠেন কারিগররা। নৃসিংহ মহাপাত্র নামের এক প্রবীণ কাঠমিস্ত্রি ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, “রথ নির্মাণের পর যে ছোট ছোট অব্যবহৃত কাঠের টুকরো বেঁচে যায়, সেগুলি নেওয়ার অধিকার আমাদের রয়েছে। প্রশাসন আমাদের সেই চিরাচরিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করছে এবং অযথা কাজে হস্তক্ষেপ করছে।”[TECHTARANGA-POST:10043]বিক্ষোভকারী কাঠমিস্ত্রিদের স্পষ্ট বক্তব্য, তাঁরা কখনও রথ তৈরির বড় বা মূল্যবান কাঠ বাড়ি নিয়ে যাননি। সাধারণত রথ খোদাইয়ের পর পড়ে থাকা চার ফুটের কম দৈর্ঘ্য এবং তিন ফুটের কম প্রস্থের ছোট ছোট ছাঁট টুকরোই তাঁরা স্মৃতি ও আশীর্বাদ হিসেবে সংগ্রহ করতেন। প্রশাসনের এই হঠাৎ নেওয়া সিদ্ধান্তকে একতরফা, অন্যায্য এবং অযৌক্তিক বলে দেগে দিয়েছেন তাঁরা। প্রসঙ্গত, মহাপ্রভুর এই রথ নির্মাণ যজ্ঞে কাঠমিস্ত্রি, কামার, কাঠুরে, দর্জি ও চিত্রকর মিলিয়ে প্রায় ২০০ জন দক্ষ কারিগর যুক্ত রয়েছেন। ফলে তাঁদের এই কর্মবিরতিতে ১৬ জুলাইয়ের রথযাত্রার প্রস্তুতি বড়সড় ধাক্কা খাওয়ার উপক্রম হয়েছিল।পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে তড়িঘড়ি ময়দানে নামে শ্রী জগন্নাথ মন্দির প্রশাসন। তিনটি রথের প্রধান প্রধান সূত্রধরদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকে বসেন আধিকারিকরা। পরে এসজেটিএ-র নীতি প্রশাসক প্রিয়রঞ্জন প্রুস্টি জানান, আলোচনার মাধ্যমে আপাতত বরফ গলেছে এবং সূত্রধররা পুনরায় কাজে ফিরেছেন। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, কারিগরদের ক্ষোভ প্রশমন করতে ওই অবশিষ্ট কাঠের পরিবর্তে তাঁদের বিশেষ আর্থিক ক্ষতিপূরণ দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। মন্দির কর্তৃপক্ষের দাবি, ভবিষ্যতে রথ নির্মাণে পুনঃব্যবহারের স্বার্থেই এই ছাঁট কাঠ সংরক্ষণ করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে এবং সেই কারণেই এই নতুন বিধিনিষেধ।[TECHTARANGA-POST:10007]চলতি ২০২৬ সালের ১৬ জুলাই মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে পুরীর রথযাত্রা। প্রতি বছরের মতো এবারও ভগবান জগন্নাথের ৪৫.৬ ফুট উঁচু ‘নন্দীঘোষ’, ভগবান বলভদ্রের ৪৫ ফুট উঁচু ‘তালধ্বজ’ এবং দেবী সুভদ্রার ৪৪.৬ ফুট উঁচু ‘দর্পদলন’ রথ নির্মাণের জন্য প্রায় ৮৬৫টি বিশাল কাঠের গুঁড়ি ব্যবহার করা হচ্ছে। প্রশাসনের আশ্বাসে রথযাত্রার আগের এই সাময়িক অচলাবস্থা কাটলেও, ছাঁট কাঠ এবং কারিগরদের ভাবাবেগ নিয়ে তৈরি হওয়া এই সুক্ষ্ম বিতর্ক ভবিষ্যতে আবারও বড় আকার ধারণ করতে পারে বলে মনে করছেন ওড়িশার ওয়াকিবহাল মহল।