Habibpur Durga Puja: কাঁটাতার মুছতে পারেনি বিশ্বাস, পুরোহিত ছাড়াই নিজস্ব সংস্কৃতিতে দেবীর আরাধনা মালদহের আদিবাসী গ্রামে
মালদহ: ১৯৪৭ সালের দেশভাগ মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, ভূখণ্ড ভাগ করেছিল। কিন্তু ভিটেমাটি হারানোর যন্ত্রণাও মুছে দিতে পারেনি শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস ও ভক্তির টান। কাঁটাতার পেরিয়ে বাংলাদেশ থেকে এ পারে চলে আসার সাড়ে সাত দশক পরেও আদিবাসী ঐতিহ্য ও নিজস্ব ভাষায় আরাধনা করা হচ্ছে দেবী দুর্গার। মালদহের হবিবপুর ব্লকের কেন্দপুকুর অঞ্চলের ভাঙাদিঘী গ্রামে আজও ঐতিহ্য মেনে আয়োজিত হয় এই ব্যতিক্রমী দুর্গাপূজা। নেই কোনও ব্রাহ্মণ পুরোহিতের আধিপত্য, নেই কোনো সংস্কৃত মন্ত্রোচ্চারণ। নিজস্ব সাঁওতালি ভাষা ও নিজস্ব ধর্মীয় রীতিনীতিকে সম্বল করেই বছরের পর বছর ধরে এখানে দেবী দুর্গার মহামায়া রূপকে আবাহন জানান গ্রামবাসীরা।এই পুজোর সলতে পাকানোর ইতিহাস শুরু হয়েছিল অবিভক্ত ভারতের মাটিতে। বর্তমানে বাংলাদেশের নাচোল থানার হাকরোল গ্রামে লব হাঁসদা নামের এক প্রবীণ আদিবাসী স্বপ্নাদেশ পেয়ে ঘট স্থাপনের মাধ্যমে দেবী আরাধনার সূচনা করেছিলেন। দেশভাগের নিষ্ঠুর পরিণতিতে ভিটেমাটি ছেড়ে ভারতে চলে আসতে বাধ্য হয় লব হাঁসদার পরিবার-সহ একাধিক আদিবাসী পরিবার। মালদহের জঙ্গলঘেরা তৎকালীন ভাঙাদিঘী গ্রামে নতুন করে জীবনসংগ্রাম শুরু করলেও বন্ধ হয়নি দেবীর আরাধনা। লব হাঁসদার হাতে শুরু হওয়া সেই পুজো পরবর্তীতে তাঁর বংশধর বাবুলাল হাঁসদার হাত ধরে আজ ১৫০ বছরেরও বেশি প্রাচীন ঐতিহ্যকে বহন করে চলেছে।নিজস্ব ভাষার মন্ত্রপাঠ ও সমাজ সংস্কৃতির মেলবন্ধনভাঙাদিঘী গ্রামের এই সর্বজনীন দুর্গাপূজার মূল আকর্ষণ হলো এর অনন্য রীতি। সনাতন পদ্ধতির ব্রাহ্মণ পুরোহিতের পরিবর্তে গ্রামেরই কোনো প্রবীণ আদিবাসী পুজোর পুরোহিতের দায়িত্ব সামলান। সাঁওতালি ভাষাতেই পাঠ করা হয় পুষ্পাঞ্জলি ও আবাহনের মন্ত্র। দেবীর আরাধনা থেকে শুরু করে বলিদানের বিকল্প আচার, সবটাতেই স্পষ্ট আদিবাসী সংস্কৃতির নিজস্বতা। বহু বছর ধরে টিনের চালার নিচে সাধারণ বেদিতে মা দুর্গা পূজিত হলেও আজ তা প্রায় ২০০টি আদিবাসী পরিবারের প্রাণের উৎসবে পরিণত হয়েছে।সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এখন পুজোর পরিচালনভার তুলে দেওয়া হয়েছে 'আদিবাসী সর্বজনীন দুর্গাপূজা কমিটি'র হাতে। যৌথ সামাজিক প্রচেষ্টায় ও গ্রামবাসীর আর্থিক সহযোগিতায় তৈরি হচ্ছে নতুন পাকা মন্দিরও। উৎসবের দিনগুলিতে আয়োজিত হয় পংক্তিভোজন, যেখানে ভেদাভেদ ভুলে একসঙ্গে বসে আহার গ্রহণ করেন সাধারণ মানুষ। চলতি বছরে রাজ্য সরকারের বিশেষ ১ লক্ষ টাকার আর্থিক অনুদানও পেয়েছে এই পুজো কমিটি। সীমানা পুনর্নির্ধারণের রক্তঝরা ইতিহাস পেরিয়েও সংস্কৃতি ও বিশ্বাসের এ হেন মেলবন্ধন প্রমাণ করে, ভৌগোলিক কাঁটাতার অন্তত উৎসবের আনন্দ ও সামাজিক সম্প্রীতিকে রুদ্ধ করতে পারে না।